Home / জাতীয় / মাছ খামো না ইলিশ

মাছ খামো না ইলিশ

নিউজ ডেস্ক:
শাস্ত্রে আছে মাছ অবতার এবং শুভ’র প্রতীক। বলা হয় অবতারগণ মর্তে আসেন অনাচার ও পাপ থেকে বিশ্বকে পরিত্রাণ দিতে। মাছও তেমনি প্রোটিন, ফ্যাট, আয়রন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস ইত্যাদি দিয়ে নিজে হয় ভোগের বস্তু আর মানুষকে পরিত্রাণ দেয় অপুষ্টি ও দুর্বলতা থেকে।

এদিকে এশিয়ান জার্নাল অব ক্লিনিক্যাল নিউট্রিশন এ প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘নিউট্রিশনাল স্ট্যাটাস, ডায়েটরি ফুড অ্যান্ড নিউট্রিয়েন্ট কনজাম্পশন প্যাটার্নস ইন মঙ্গা অ্যাফেক্টেড এরিয়া অব দ্য নর্দার্ন পার্ট অব বাংলাদেশ’ এ বলা হয়েছে- অপুষ্টিতে বেঁটে হচ্ছে চিলমারীর মানুষ। গোটা কুড়িগ্রামের অবস্থাই এরকম। এর সাথে যে মাছ খাওয়ার যোগ আছে একথা কেউই অস্বীকার করবে না। যখন সারা দেশের মানুষ গড়ে মাছ খায় ১২ কেজি তখন কুড়িগ্রামের মানুষ খায় গড়ে সাড়ে ৭ কেজি। ফলে বেঁটে না হয়ে উপায় কি? কিন্তু এ দুর্গতি কেন? আমাদের তো বিশাল ব্রহ্মপুত্র আছে। তবে কি এ অববাহিকায় অবতার আসছেন না?


মাছ আসবে কেমনে- নদীতে যে পানি নেই। গত শতকের মধ্যভাগেও বৃহত্তর রংপুরের নদ-নদীগুলো- ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, বুড়িতিস্তা, দুধকুমার, গঙ্গাধর ইত্যাদি ছিল ভরা যৌবনা। তখন এগুলো ছিল নানা জাতের মাছে ভরা। এছাড়াও মাছের উৎস হিসেবে ছিল বড় বড় বিল ও জলাশয়। এখানকার মাছের প্রাচুর্যতা স্থানীয় চাহিদা মিটিয়ে অন্য অঞ্চলেও রপ্তানি হত। উজানে ভারতের অংশে বাঁধ, ব্যারেজের বদৌলতে এই নদীগুলো এখন পানিশূন্য। ব্রহ্মপুত্রও বেঁচে আছে কোনরকমে। এলাকার চাহিদা মেটানোই এখন দায়। কুড়িগ্রামের নুন খাওয়া এবং যাত্রাপুর মৎস্যবন্দরের গৌরব হারিয়েছে বহুকাল আগেই। চিলমারীর অবস্থাও যায় যায়।

নদীতে পানি না থাকায় বিলগুলোতেও আগের মত পানি থাকে না। তারপরও কুড়িগ্রামের টগরাই বিল; চিলমারীর কোদাল ধোয়া, করার বিল, উদনা বিল; উলিপুরের সোনানায়ের বিল, দামুয়ার বিল, কানকাটা বিল; রাজারহাটের চাকিরপাশা বিল বর্ষা মৌসুমেই কেবল কিছু মাছের যোগান দেয়। ফলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে নির্ভর করতে হয় বাইরের চালানের মাছের উপর। এই মাছ আবার চাষ থেকে শুরু করে বিপণন পর্যন্ত এত প্রকার ক্যামিকেলে ঢাকা থাকে যে মাছ খাই না বিষ খাই আলাদা করে বলা মুশকিল।


১৮৭২ সালের এক আদমশুমারি অনুযায়ী- বৃহত্তর রংপুর অঞ্চলের মোট জনসংখ্যা ২১,৪৫,৯৭২ জনের মধ্যে ১,৯৮,৭৯৯ জন মৎস্যজীবী সম্প্রদায়ের লোক ছিলেন। তাঁরা ব্রহ্মপুত্র- তিস্তা অববাহিকার বিভিন্ন শাখা-প্রশাখা এবং পার্শ্ববর্তী বিল- জলাশয়ে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করতেন। এসব মাছের মধ্যে ছিল- রুই, কাতলা, মৃগেল, চিতল, বোয়াল, কালবাউশ, আইর, শিং, মাগুর, রিঠা, পাবদা, বাচা, ঘাউড়া, ভ্যাদা, কৈ, পুঁটি, খলিশা, চেলা, চাপিলা, ইলিশ ইত্যাদি নানান জাতের মাছ। ব্রহ্মপুত্রের বিখ্যাত ছিল বাঘাইড় মাছ।

উজানে পানি প্রত্যাহারের ফলে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা এসব মাছ এখন বিলুপ্তির খাতায় প্রায়। ইদানীং কিছু প্রজাতি পুকুরে চাষ হচ্ছে, তবে তা নদীর খিদে খালে মেটার মত অবস্থা! জেলে সম্প্রদায়ের লোকেরা হয় পেশা বদল করছেন নয়তো করছেন বাইরে থেকে আমদানি করা মাছের ব্যবসা। ফলে কমে যাচ্ছে মৎস্য শিকারি জেলের সংখ্যা। এদিকে গত শতকের আশির দশক থেকে বৃহত্তর রংপুর অঞ্চল এখনও মৎস্য ঘাটতি এলাকা হিসেবে চিহ্নিত।

১৯৮৩ সালের এক সরকারি হিসেবে দেখা যায়- প্রাকৃতিক ও কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে বৃহত্তর রংপুরে মোট মাছের উৎপাদন সেবছর ছিল  ১,৩১,৩০০ মণ। তার মধ্যে ইলিশই ছিল ২৪০০ মণ। অন্যান্য মাছ পুকুরে চাষ হলেও এই অঞ্চলে বিশেষ করে কুড়িগ্রামে ইলিশ পাওয়া যায় অক্টোবর মাসেই অর্থাৎ প্রজননের সময় ইলিশ যখন মেঘনার মোহনা বেয়ে উজানে ব্রহ্মপুত্রে চলে আসে তখনই। নির্দিষ্ট সময়ে পাওয়া গেলেও মৎস্য ঘাটতির এ অঞ্চলে এ সময় খাদ্য চাহিদা মেটাতে ইলিশ অবশ্যই একটি ফ্যাক্টর। কিন্তু সে কপালও বেশিদিন থাকেনি এখানকার মানুষের।


দাম সারা বছর আকাশ ছোঁয়া থাকায় কুড়িগ্রামের মানুষ ইলিশের স্বাদ প্রায় ভোলার পথে। অক্টোবের এ সময়টাতে ব্রহ্মপুত্রে ইলিশ ধরা পড়ায় এখানকার মানুষেরা তিন / চারশো টাকায় ইলিশ খেতে পায়। ২০১৭ তে সরকার কুড়িগ্রাম জেলার ৬ টি উপজেলাকে ইলিশ জোন হিসেবে ঘোষণা দেওয়ার পর প্রজননের সময়কালে দক্ষিণের ন্যায় ব্রহ্মপুত্রেও ইলিশ ধরা নিষিদ্ধ হয়েছে। ইলিশের নামে এ সময় নদীতে সকল প্রকার মাছ ধরাই নিষিদ্ধ হয়। ফলে জেলেদের দুর্ভোগও থাকে চরম পর্যায়ে।

গত দুই বছর মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকলেও সরকারের পক্ষ থেকে কোন সাহায্য পায়নি জেলেরা। এ বছর তালিকাভুক্ত ৬ উপজেলার ৭ হাজার ৯৩৫ জন ইলিশ জেলের মধ্যে ৪ হাজার ৭৬১ জন জেলেকে খাদ্য সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে জেলা মৎস্য বিভাগ। তাও আবার নিষিদ্ধের ২২ দিনের জন্যে ২০ কেজি চাল। ২০ কেজি চালে ২২ দিনের সংসার গাধার পিঠে হাতি হয়ে গেল না! বাকি জেলেদের হিসেব মেলাবে কে?


কুড়িগ্রামের লোক প্রজননের এই সময়টাতেই শুধু ইলিশ পায় উজানে আসার কারণে। ইলিশের এ উজান যাত্রা শুধু ব্রহ্মপুত্রেই নয়  ভারতের আসাম থেকে পাকিস্থানের সিন্ধু, ইরাকের টাইগ্রিস থেকে ইরানের সাত-ইল- আরব অবধি। আইন করে না হয় ইলিশ ধরা ঠেকানো গেল কিন্তু উজান যাত্রা ঠেকাবে কে? উজানের জেলেরা তো মা ইলিশ বলে রেহাই দেয় না!

আমরা ইলিশ ধরলাম না কিন্তু আমাদের ইলিশ খাওয়ার পথ কি? জাতীয় মাছ কেন আজও সহজলভ্য হল না? আমরাও মা ইলিশ ধরার বিপক্ষে  কিন্তু চোখের সামনে দিয়ে ইলিশ উজানের পেটে যাবে আর আমরা কি বসে বসে গান বাঁধব- ‘হামারে ইলশ্যা উজ্যানে যায় হামারে ব্রহ্মপুত্র দিয়া…’

Check Also

স্থায়ী কমিটির বৈঠকে ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া নিয়ে আলোচনা

নিউজ ডেস্ক: স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির চতুর্থ বৈঠকে ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া এবং এডিস …

%d bloggers like this: