Home / দেশজুড়ে / খুলনা / দরবারের মসজিদ জরাজীর্ণ, বিলাসবহুল বাড়িতে থাকেন পীর!

দরবারের মসজিদ জরাজীর্ণ, বিলাসবহুল বাড়িতে থাকেন পীর!

নিউজ ডেস্ক: বরগুনার বেতাগীতে খ্যাতিসম্পন্ন মোকামিয়া দরবার শরিফের জরাজীর্ণ মসজিদের পলেস্তরা খসে পরলেও দরবারের বর্তমান পীর ও মোকামিয়া আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ শাহ মো. মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করেছেন বিলাসবহুল এক বাড়ি। নয় হাজার স্কয়ার ফিটের বাড়িটি এলাকাবাসীর নজর কেড়েছে। এটি দেখে পীরের মুরিদ ও স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

এ বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে শাহ মো. মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস বলেন, ‘আমি বাংলাদেশের মধ্যে একজন অন্যতম ঠিকাদার।’ কোথায় কি কি কাজ করেছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজের কথা ঠিক মনে নেই।’

এলাকার কোন লোকও জানেন না তিনি কোন ধরনের ঠিকাদার। এছাড়াও তার বিরুদ্ধে মোকামিয়া দরবার শরিফের দান করা কোটি কোটি টাকা ও মুরিদদের দান করা সম্পত্তি ব্যক্তিগত কাজে দখল করার অভিযোগ রয়েছে।

মোকামিয়া দরবার শরিফের পীর ও মোকামিয়া আলিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ শাহ মো. মাহমুদুল হাসান ফেরদৌসের বাড়ি বরগুনা জেলার বেতাগী উপজেলার মোকামিয়া ইউনিয়নের মাদ্রাসা বাজারে। তার বাবা মরহুম আবদুল আজিজ মাওলানা ছিলেন মোকামিয়া আলিয়া মাদ্রাসার একজন শিক্ষক ও মোকামিয়া দরবার শরিফের খাদেম। আট ভাই ও দুই বোনের মধ্যে সবার বড় ফেরদৌস।

তিনি খ্যাতিসম্পন্ন পীর হযরত হাসান উদ্দিন (র.) এর বাড়ির পাশের চাচাতো ভাইয়ের নাতি সম্পর্কের হন। এমন দূর-সম্পর্কের একজন অর্থলোভী ব্যক্তিকে দিয়ে দরবার শরিফের পরিচালনায় দ্বিমত জানিয়েছেন উপজেলার সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ, মাদ্রাসার কয়েকজন ছাত্র এবং মুরিদেরা।

রাতারাতি তার এ উত্থান নিয়ে এলাকায় রয়েছে নানা সমালোচনা। উপজেলার মানুষের মনে তার আয় নিয়ে নানা প্রশ্ন ও জিজ্ঞাসা রয়েছে। এত অর্থ-সম্পত্তির মালিক হওয়া সত্ত্বেও দরবার শরিফের জরাজীর্ণ মসজিদের উন্নয়নের দিকে তার কোন খেয়াল নেই। মসজিদটির বৈদ্যুতিক ওয়্যারিং বিকল হয়ে আছে। খসে খসে পড়ছে পলেস্তারা, সামান্য বৃষ্টি হলেই ছাদ বেয়ে পানি পড়ে মেঝেতে।

এছাড়াও দরবার শরিফের কোন খাদেম বা অন্য কর্মরত কেউ সামান্য এদিক সেদিক করলেই তাদের বেত দিয়ে পেটানোরও একাধিক অভিযোগ রয়েছে ফেরদৌসের বিরুদ্ধে।

এমন এক ঘটনার ভুক্তভোগী দরবার শরিফের ইয়তিম খানার বাবুর্চি আব্দুল করিম। তিনি বলেন, ‘কয়েকদিন আগে দরবারে দান করা ছাগল বিক্রি করে এতিমখানায় বাজার করার অপরাধে আমাকে মধ্যযুগীয় কায়দায় তার (পীর ফেরদৌস) কক্ষে ডেকে নিয়ে দরজা আটকিয়ে বেত্রঘাত করেছে ও লাঞ্ছিত করেছেন।’

যে বিষয়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যর নিকট সুবিচারের জন্য লিখিত অভিযোগও দিয়েছেন তিনি।

করিম আরো বলেন, ‘সৌদি আরবের নাম ভাঙিয়ে চলা এ পীরের অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে মুখ খুলতেও সাহস পাচ্ছে না এলাকাবাসী।’

স্থানীয় বাসিন্দা মো. হেমায়েত উদ্দিন বলেন, ‘তার বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণের সময় আমার পৈত্রিক সম্পত্তি দখল করেছেন। আমি বাধা দিলে আমাকে লাঞ্ছিত করেছেন। যা নিয়ে বরগুনা কোর্টে এখনো আদালত মামলা চলছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘এছাড়াও সে একাধিক জায়গায় দরবারে মুরিদদের দান করা সম্পত্তি দখল করে নিজের করে নিয়েছেন। বানিয়েছেন একাধিক স্থাপনা।’ এ নিয়ে তাদের আপন ভাইদের মধ্যে মতবিারোধ রয়েছে বলেও জানান তিনি।

নাম না প্রকাশের শর্তে স্থানীয় এক বাসিন্দা জানান, হোক ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী, ছাত্র, শিক্ষক অথবা কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থক, সামাজিক কোনো সমস্যা অথবা পারিবারিক কোনো বিষয়ে পীরের কাছে গেলেই, ‘এই এটা আমার রুম, বিরক্ত করিস না একদম সাঁটিয়ে দিব’ বলে হুমকি দেন।

তারা জানান, দুর্নীতির মাধ্যমে নিজের আখের গুছিয়ে একাধিক বাড়ি-গাড়ির মালিক হয়েছেন তিনি। ঢাকার বিভিন্ন স্থানে রয়েছে একাধিক বাড়ি ও কোটি কোটি টাকার সম্পত্তি।

২০১৯ সালের এনটিআরসি নিয়োগের সময় ভুক্তভোগী এক শিক্ষিকার স্বামী মো. জসিম তার কাছে গেলে তাকে প্রায় এক মাস ঘুরিয়ে জানান, দরবারের উন্নয়নের জন্য তাকে কিছু দিলে সে কাজ করে দিবে।

বিগত দিনে এই পীরের বিরুদ্ধে জমিসংক্রান্ত সালিশ মীমাংসার নামে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেয়ারও অভিযোগ উঠে একাধিকবার। স্থানীয় হুজুর বাড়ির এক সালিশীতে লাখ টাকা নিয়েছেন বলে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ভুক্তভোগী বাংলা’কে জানান। তবে টাকা নেয়ার পরও তার সমস্যার সমাধান করেননি এই ‘পীর’।

স্থানীয় বাসিন্দা মারুফ হোসেন বলেন, ‘এক কথায় বলা যায় বেতাগীতে একসময়ের মানুষের কাছে যেন আতঙ্কের অপর নাম মাওলানা ফেরদৌস।’ তিনি সর্বদা কোমরে পিস্তল নিয়েও চলাফেরা করতেন বলেও অভিযোগ।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন বলেন, ‘পীরসাহেব মাঝে মাঝে ঢাকা থেকে কিছু অপরিচিত লোকদের ঢাকা থেকে নিয়ে আসেন এবং তাদের নিয়ে কুয়াকাটাসহ বিভিন্ন দৃষ্টিনন্দন স্থানে ঘুরতে যান। ঘোড়ায় চরে ঘুরে বেড়ান, মিটিং করেন, যা ফেসবুকসহ নানা সামাজিক মাধ্যমে ইতোমধ্যে প্রকাশ পেয়েছে।’

স্থানীয় সংসদ সদস্য শওকত হাচানুর রহমান রিম বাংলা’কে বলেন, ‘একজন পীরসাহেবের পক্ষে এমন জঘন্য কার্যকলাপে লিপ্ত থাকা ঠিক নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘বাবুর্চিকে পেটানোর এ ঘটনার সুষ্ঠু ও দৃষ্টান্তমুলক বিচার হবে। সকলের সহযোগিতা পেলে এ দরবার ও মাদ্রাসার দুর্নীতি বন্ধ করা হবে। দরবারের টাকায় পীরসাহেব আলিশান বাড়ি বানিয়ে জীবন যাপন করছেন, অথচ দরবারের মসজিদটি আজো জরাজীর্ণ অবস্থায় আছে। পীরসাহেব সবসময় ব্যক্তিগত আরাম-আয়েশে ব্যস্ত থাকায় মাদ্রাসা ও লিল্লাহসহ এতিমখানার খোঁজ রাখেন না।’

এ বিষয়ে ঢাকায় অবস্থানরত শাহ মোহাম্মদ মাহমুদুল হাসান ফেরদৌস মুঠোফোনে বলেন, ‘আমার ব্যাক্তিগত উপার্জিত অর্থে বাড়ি নির্মাণ করেছি। আমার ব্যক্তিগত কোন সম্পদে দরবারের দান করা অর্থের সাথে কোন সম্পৃক্ততা নেই।’

Check Also

মাসে একবার দেখা হতো তাদের, এখন তাও হবে না

নিউজ ডেস্ক: হবিগঞ্জ শহরে একাই থাকতেন আলী মো. ইউছুফ। তিনি হবিগঞ্জ লিটল ফ্লাওয়ার কেজি অ্যান্ড …

%d bloggers like this: