Home / আর্ন্তজাতিক / ফিদেলকে লেখা চে গুয়েভারার বিদায়ী চিঠি

ফিদেলকে লেখা চে গুয়েভারার বিদায়ী চিঠি

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: আজ ৯ অক্টোবর। চে গুয়েভারার মৃত্যুবার্ষিকী। ১৯৬৭ সালের এই দিনে ঘাতকরা তাকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করে। সারাবিশ্বের বিপ্লবীদের কাছে চে একটি অনুপ্রেরণার নাম। ফলে আর্জেন্টিনায় জন্ম নেওয়া চে কেবল নির্দিষ্ট দেশের নন। তিনি সকল দেশের, সব মানুষের।

কিউবায় বন্ধু ফিদেল কাস্ত্রোকে বিপ্লবে সাহায্য করে চে এগিয়ে যান বলিভিয়ার উদ্দেশ্যে। এক পর্যায়ে ধরা পড়েন সিএআই সমর্থিত বলিভিয়ার সৈন্যদের হাতে। ১৯৬৭ সালের ৭ অক্টোবর তিনি আহত অবস্থায় আটক হন। এরপর ৯ অক্টোবর তাকে হত্যা করা হয়। দুই হাত কেটে নেওয়া হয়। কিউবা ছাড়ার আগে তিনি তার প্রিয় বন্ধু কিউবার প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রোকে একটি বিদায়ী চিঠি লেখেন। বাংলা’র পাঠকদের জন্য সেটা প্রকাশ করা হলো—

কৃষিবর্ষ

এপ্রিল ১, ১৯৬৫

হাভানা

ফিদেল,

এ মুহূর্তে আমার অনেক কথা মনে পড়ছে। যখন আপনার সঙ্গে মারিয়া আন্তোনিয়ার বাড়িতে দেখা হয়, আপনার সঙ্গে যোগ দেয়ার জন্য যখন আপনি প্রস্তাব দেন— প্রস্তুতি পর্বের সব উত্তেজনা, সব মনে পড়ছে। একদিন তারা এসে যখন জিজ্ঞেস করল যদি মৃত্যু ঘটে, তাহলে কাকে জানাতে হবে— বাস্তবিক মৃত্যুর আশঙ্কা আমাদের সবাইকে আঘাত করল। পরে আমরা জানলাম আসলে এটাই সত্য, বিপ্লবে (যদি এটা সত্যিকারের বিপ্লব হয়) একজন জয়ী হয় কিংবা মৃত্যুবরণ করে। অনেক কমরেড বিজয়ের পথে মৃত্যুকে বরণ করেছে।

আজ সবকিছুরই নাটকীয় স্বর লাঘব পেয়েছে, কারণ আমরা অনেক বেশি পরিপক্ব হয়ে উঠেছি কিন্তু ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটতে চলেছে। কিউবার অধিক্ষেত্রে আমার যে কর্তব্য কিউবার বিপ্লবের সঙ্গে আমাকে বেঁধে দিয়েছিল, আমি মনে করি আমি তা লালন করেছি। আমি আপনার কাছ থেকে বিদায় নিচ্ছি, কমরেডদের কাছ থেকে, আপনার জনগণের কাছ থেকে, অবশ্য এখন তারা আমারও, বিদায় নিচ্ছি।

পার্টির নেতৃত্বে আমার যে অবস্থান, মন্ত্রীর পদ থেকে, কমান্ডারের র‌্যাঙ্ক থেকে পদত্যাগ করলাম এবং আমার কিউবান নাগরিকত্ব সমর্পণ করলাম। আইনি কোনো কিছুই আমাকে আর কিউবার সঙ্গে বেঁধে রাখছে না। একমাত্র বন্ধনটি অন্য ধরনের, যা ভাঙা যায় না— নিয়োগকৃত কোনো পদ থেকে যেমন সরে আসা যায়।

আমার বিগত জীবন পর্যালোচনা করে বিশ্বাস করি আমি পর্যাপ্ত সততা ও আত্মত্যাগের সঙ্গে কাজ করে বৈপ্লবিক বিজয় সংহত করতে পেরেছি। আমার একমাত্র বড় ব্যর্থতা ছিল সিয়েরা মেস্ত্রার সেই প্রথম মুহূর্ত থেকে আপনার ওপর আরো আস্থা না রাখা, একজন নেতা ও বিপ্লবী হিসেবে আরো দ্রুত আপনার গুণাগুণ বুঝতে না পারা।

আপনার পাশে আমার অত্যন্ত চমকপ্রদ দিন কেটেছে। উজ্জ্বল ও দুঃখময় ক্যারিবীয় দিনগুলোয় ক্যারিবীয় (মিসাইল) সংকটে আমি যে আমাদের মানুষের পাশে থাকতে পেরেছি, এ আমার অনেক অহংকার। সেসব দিনে আপনি যে রকম রাষ্ট্রনায়কোচিত ভূমিকা রেখেছিলেন, এমন নজির কদাচিত্ মিলবে। আমি যে নির্দ্বিধায় আপনাকে অনুসরণ করতে পেরেছি, আপনার চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে নিজেকে মেলাতে পেরেছি, বিপদ ও নীতির মূল্যায়ন করতে পেরেছি, সেজন্যও গর্বিত।

পৃথিবীর অন্যান্য জাতি আমার সহযোগিতার বিনীত উদ্যোগ প্রত্যাশা করে। সেটা আমি করতে পারি কিন্তু কিউবার প্রধান হিসেবে আপনার যে দায়িত্ব, তা ছেড়ে আসা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়, কাজেই আমাদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার সময় এসে গেছে।

আপনি এটা অনুধাবন করবেন আনন্দ ও বেদনার এক মিশ্রণের মধ্য দিয়ে আমাকে এটা করতে হচ্ছে। একজন নির্মাতা হিসেবে আমি এখানে আমার বিশুদ্ধতম আশা এবং এখানে যাদের আঁকড়ে ধরে ছিলাম, সেই প্রিয়তম মানুষদের রেখে যাচ্ছি। যে মানুষেরা আমাকে পুত্রের মতো বরণ করেছিল, আমি তাদের ছেড়ে যাচ্ছি। এটা আমার আত্মার একটি অংশকে জখম করে। আপনি আমাকে যে শিক্ষা দিয়েছেন, আমার মানুষের বিপ্লবী উদ্যম সবচেয়ে পবিত্র দায়িত্ব পালন করার তাগিদ— গভীরতম ক্ষতকেও সারিয়ে তোলে— আমি এসব নিয়ে নতুন রূপায়ণে যাচ্ছি।

আমি আরো একবার বলতে চাই আমি কিউবাকে আমার ব্যাপারে সব দায়িত্ব থেকে মুক্তি দিয়েছি, কেবল এর উদাহরণ থেকে যে দায়িত্বের জন্ম হয়, তা বাদে আর সকলই। জীবনের শেষ মুহূর্তগুলোয় আকাশের নিচে থাকি, আমার শেষ চিন্তা হবে এই মানুষদের নিয়ে এবং আপনাকে নিয়ে। আপনি আমাকে যে শিক্ষা ও আপনার যে উদাহরণ দিয়েছেন, সেজন্য আমি কৃতজ্ঞ, আমার কাজের শেষ পরিণতি পর্যন্ত আমি বিশ্বস্ত থাকতে চেষ্টা করব।

আমাদের বিপ্লবের পররাষ্ট্র নীতির সঙ্গে আমাকে চিহ্নিত করা হয়েছে এবং এখনো তা হচ্ছে। আমি যেখানেই থাকি না কেন কিউবান বিপ্লবী হিসেবে আমি আমার দায়িত্ব অনুভব করি। আমি যে আমার স্ত্রী ও সন্তানদের জন্য বস্তুগত কিছু রেখে যাচ্ছি না, সেজন্য আমি দুঃখিত নই, বরং এমনটাই যে হয়েছে সেজন্য আমি খুশি। আমি তাদের জন্য কিছুই চাই না। কারণ রাষ্ট্র বেঁচে থাকার জন্য ও পড়াশোনা করার জন্য পর্যাপ্ত সহায়তা দেবে।

আপনাকে এবং আমাদের জনগণকে বলার মতো আমার অনেক কিছুই ছিল, কিন্তু এখন মনে করি এর সবই অপ্রয়োজনীয়। আমি যেভাবে বলতে চাই শব্দ সেভাবে তা প্রকাশ করতে পারে না; আর কাগজের ওপর আঁকিবুঁকি করার কোনো মানেই নেই।

* * *

চে গুয়েভারার শেষ চিঠিতে ফিদেল কাস্ত্রোর যত স্তুতিই থাকুক না কেন, দুজনের সখ্যে যে ফাটল ধরেছিল, এতে সন্দেহ নেই।

৮ অক্টোবর ১৯৬৭ সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী ও গেরিলা সৈনিক চে বলিভিয়ার অরণ্যে সেখানকার মার্কিন সমর্থনপুষ্ট সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন, পরদিন ৯ অক্টোবর তাকে হত্যা করা হয়। তারা চের হাত দুটি শরীর থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলে এবং অচিহ্নিত একটি কবরে তাকে মাটিচাপা দেয়।

১৯৯৭ সালে চে গুয়েভারার দেহাবশেষ আবিষ্কৃত হয়। তা কিউবায় পাঠানো হলে প্রেসিডেন্ট ফিদেল কাস্ত্রো আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে সমাহিত করেন। ফিদেল বলেন, স্বাধীনতার শিল্পী, রণাঙ্গনের শিল্পী। চে কেড়ে নেন বিশ্বের প্রতিবাদী যুব সমাজের অন্তর। বুকে চের ছবি লাগানো টি-শার্ট এখনো তারুণ্যের প্রিয় পোশাক।

বাতিস্তাকে উত্খাত করার লক্ষ্যে ১৯৫৩ সালে ফিদেল কাস্ত্রোর নেতৃত্বে মনকাডা ব্যারাক আক্রমণ করা হয়। এই ব্যর্থ অভিযানের পর এক বছর জেল খেটে ফিদেল বেরিয়ে আসেন এবং তরুণ ডাক্তার চে গুয়েভারার সঙ্গে তার সাক্ষাত্ হয়। চে চাইছেন যুক্তরাষ্ট্রের শোষণমূলক ধনবাদী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উত্খাত। দারিদ্র্য ও দুর্ভিক্ষ ছেয়ে আছে গোটা দক্ষিণ আমেরিকা। চে যোগ দিলেন কাস্ত্রোর সঙ্গে, কয়েকটি ব্যর্থ প্রচেষ্টার পর ১৯৫৯ সালে বাতিস্তা রাজত্বের অবসান ঘটল। নতুন স্বাধীন রাষ্ট্রে চেও মন্ত্রী হলেন, সেনাবাহিনীর প্রধান প্রশিক্ষক হলেন, ন্যাশনাল ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট হলেন। কিন্তু স্থিত হওয়া যে তার চরিত্রের মধ্যে নেই। তিনি দাঁড়াবেন স্বাধীনতাকামী মানুষের পাশে। ১৯৬৫ সালে তিনি কিউবা থেকে বেরিয়ে আসেন, মুক্তিকামী সব মানুষের জন্যই তাকে লড়তে হবে। তিনি তখন বলিভিয়ায় স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন দানা বাঁধিয়ে দিচ্ছেন।

বলিভিয়া অবরুদ্ধ হলো, সিআইএ সমর্থনপুষ্ট বলিভিয়ার সেনাবাহিনী চে গুয়েভারাকে ধরে ফেলে। নির্মম মৃত্যুর শিকার হতে হয় তাকে। সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসতে তিনি ম্যানিলাকে (কাস্ত্রোর কোড) বারবার ডাকেন, কিন্তু এতটুকু সেবাও তিনি পাননি। কাস্ত্রো এমনকি তাকে রক্ষা করতে সেনাবাহিনীকেও কোনো আদেশ দেননি।

আলবার্তো মুলার দাবিই করেছেন, ফিদেল তার সবচেয়ে উপকারী বন্ধুর সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছেন। চের নির্মম মৃত্যুর দায় ফিদেল কাস্ত্রোরই।

অন্যরা বলেন, প্রশ্নই আসে না। বিপ্লব কোনো রফতানিযোগ্য পণ্য নয়। চে বলিভিয়ায় তাঁর ভুলেরই খেসারত দিয়েছেন নিজের জীবন দিয়ে।

Check Also

‘তারা ফেরেশতা নয়’

আন্তজাতিক ডেস্ক: সাবেক মিত্র সিরিয়ার কুর্দিদের কাছ থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড …

%d bloggers like this: