Home / রাজনীতি / দুর্নীতির রাজনীতি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন

দুর্নীতির রাজনীতি এবং পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন

নিউজ ডেস্ক: সম্প্রতি জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্নীতির বিরুদ্ধে একটি খুবই আশা ব্যাঞ্জক আন্দোলন সংগঠিত হয়ে গেছে। সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে কম বেশি ঘটনার আদ্যপান্ত আমরা সবাই জানি। এক হাজার চৌদ্দশ কোটি টাকার বরাদ্দ এবং তার কমিশন ভাগবাটোয়ারা নিয়ে ছাত্রলীগ এর অভ্যন্তরীণ কোন্দলের ফলে দুর্নীতির বিষয়টি সামনে চলে আসে।

ছাত্র-ছাত্রী এবং শিক্ষকরা সম্মিলিতভাবে এর প্রতিবাদ করে এবং ধারাবাহিকভাবে আন্দোলনটি করতে থাকে ২৩ এ আগস্ট থেকে। বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন প্রথম থেকেই ছাত্রলীগকে ২ কোটি টাকা কমিশন দেয়ার বিষয়টি অস্বীকার করতে থাকে। এর মধ্যেই আন্দোলনের বিপক্ষে এবং ভিসির পক্ষে প্রায় দেড়শর উপরে শিক্ষক ক্যাম্পাসে মৌন মিছিল করে। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি নিয়মিত চিত্র। আশ্চর্যজনক ভাবে সঠিক বা সত্য বলার পক্ষে আমরা কখনই মুষ্টিমেয় শিক্ষকগোষ্ঠিকে পাই না, পাইনি। কেমন কেমন করে যেন শিক্ষক সমাজের বিরাট একটা অংশ সবসময়ই সরকার দলীয় প্রশাসনের পক্ষেই হাঁটেন।

এটা যে শুধু জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়েরই ঘটনা এমন কিন্তু না। যেকোন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই আমরা সব সময়ই অল্প কিছু মুখ চেনা শিক্ষককেই প্রতিবাদ করতে দেখি। এর বাইরে বেরিয়ে সবসময়ই শিক্ষক সমাজের বিরাট একটা অংশকে দেখা যায় হয় নিশ্চুপ আছে অথবা নির্লজ্জভাবে সরকারের পক্ষে হাঁটাহাঁটি করছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে আরো একটি ঘটনা সামনে চলে এসেছে সেটা হলো, গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিক ফাতেমা তুজ জিনিয়াকে সাংবাদিক সমিতি থেকে সরিয়ে দিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য বাধ্য করে। কারণ মেয়েটি দুর্নীতির বিরুদ্ধে নিউজ করেছিলো। শুধু এতটুকুই না ফাতেমার সাথে ভিসির একটি কথোপকথন রের্কড ভাইরাল হয়েছে সেখানে দেখা যাচ্ছে ভিসি মেয়েটিকে অকথ্য ভাষায় গালাগালি করছে। তার বক্তব্যের সারর্মম এই বিশ্ববিদ্যালয় তিনি বানিয়েছেন কাজেই তিনি সবকিছু করার অধিকার রাখেন। একই সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েও দুর্নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এবং প্রশাসন টাকার বিনিময়ে নিয়োগ দিয়েছেন।

এর আগেও আমরা অসংখ্যবার দেখেছি ক্ষমতাসীন দলের যিনি ভিসি হচ্ছেন তিনি নিজেকে ভগবানের মতো ক্ষমতাধর মনে করছেন। যিনি অনুষদের ডীন হচ্ছেন তিনি নিজেকে অনুষদের ভগবানের মতো ক্ষমতাবান মনে করছেন। বিভাগের শিক্ষকরা ছাত্রছাত্রীদের কাছে নিজেদের মোটামুটি ভগবান রুপে হাজির করেন। এবং তাদের ক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ করার ক্ষমতা রাখে একমাত্র সরকারি ছাত্র সংগঠন। বিশ্ববিদ্যালয়ে যে সমস্ত শিক্ষকরা নিভৃতে পাঠ দান করে থাকেন, ছাত্রদের গবেষণায় সহযোগিতা করেন, বাইরে পড়তে যেতে সহযোগিতা করেন সেই সমস্ত শিক্ষকরা হন সবচেয়ে নিগৃহীত এবং ক্ষমতাধর শিক্ষকদের চাপে কোনঠাসা। সমস্ত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃতিটাই এরকম করে ফেলা হয়েছে, একদল শিক্ষক সবসময় সরকারের পা চাটবেন বিনিময়ে অর্থনৈতিক সুবিধা পাবেন, ক্ষমতার অপব্যবহার করতে পারবেন, ছাত্রছাত্রীদের উপর অন্যায় খবরদারী করবেন, ঠিক মতো ক্লাশ নেবেন না, পরীক্ষা নেবেন না, নিজের দল করা ছাত্রছাত্রীদের অন্যায়ভাবে বেশি নাম্বার দিয়ে প্রথম শ্রেণি পাওয়াবেন, তারপর সেই ছাত্র বা ছাত্রীকে নিয়োগ দিয়ে শিক্ষক বানিয়ে নিজেদের দল ভারী করবেন।

আবার যে ছেলেমেয়েরা আসলেই রেজাল্ট ভালো করে বিভিন্ন অযুহাতে তাদের নাজেহাল করা, পরীক্ষায় নম্বর কম দেয়া, বিভিন্ন সংগঠন করলে ব্যবহারিক পরীক্ষায় ১ বা ২ নাম্বারের জন্য ফেল করিয়ে দেয়া এগুলা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাভাবিক সংষ্কৃতিতে পরিনত হয়ে গেছে। দূরদূরান্ত থেকে পড়তে আসা ছেলেমেয়েদের ভবিষ্যত একভাবে এই সমস্ত ক্ষমতাসীন শিক্ষকদের হাতে বন্দী। আমি ছাত্র সংগঠন করবো না সাংস্কৃতিক সংগঠন করবো, না পড়শোনা করবো সমস্ত বিষয়েই ওনাদের খবরদারী চলবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের হলের খাবারের মান খারাপ, গণরুমে এক সাথে গাদাগাদি করে ছেলে মেয়েরা থাকে, ছারপোকার কামরে চর্ম রোগ হয়ে যাচ্ছে, ক্ষমতাসীন ছাত্র সংগঠন অবৈধ ভাবে সিট দখল করে থাকে, অন্যায়ভাবে প্রথম বর্ষকে দিয়ে জোড় করে দলের মিছিল করানো হয় এই সমস্ত কোনো বিষয়েই হলের হাউস টিউটর বা অন্যকোনো পদাধীকারী শিক্ষকদের কোনো ধরনের কোনো পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ দুর্নীতি থেকে শুরু করে উন্নয়ন তহবিল দুর্নীতি এই সমস্ত বিষয়ে যখন দেশের একজন সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠের সর্বোচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত শিক্ষক যুক্ত থাকেন তখন আসলে দেশের মানুষ কাদের উপর ভরসা রাখবে? আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এমন কোনো সিস্টেম করা নাই যেইখানে একজন ছাত্র বা শিক্ষক নিজেকে বঞ্চিত মনে করলে বা অন্যায় হয়েছে মনে করলে কোথাও যেয়ে প্রতিকার চাইতে পারে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট আছে কিন্তু সেটাও দলীয় সদস্য দিয়ে এমনভাবে সাজানো হয় যে সেখানে দলীয় শিক্ষকদের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা বাতুলতা মাত্র।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় এর আগেও ছাত্র আন্দোলনের মধ্যে দিয়ে সত্য প্রতিষ্ঠার উদাহরণ সৃষ্টি করেছে। এইবারও তার ব্যতিক্রম নয়। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা একটা চমৎকার আন্দোলনের মডেল হতে পারে। প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে যদি ছাত্রদের নিজেদের একটি কমন প্ল্যাটফর্ম থাকে যেইখানে চাইলে অন্যায়ের বিরুদ্ধে যে কোন সময় যে কোন শিক্ষার্থী তার বক্তব্য নিয়ে উপস্থিত হতে পারবে। গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ছাত্র সংসদের মাধ্যমে এই কাজটি হওয়ার কথা কিন্তু সেই বাস্তবতা যেহেতু এই মুহূর্তে আমাদের নেই, শিক্ষার্থীদের নিজেদের শক্তি নিজেদের তৈরী করতে হবে। এরকম পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুস্থ পরিবেশ রক্ষার্থেই ছাত্রছাত্রীদের নিজেদের শক্তি ছাড়া আসলে কোনো বিকল্প নাই। সম্মিলিত প্রতিরোধ এবং আন্দোলন ছাড়া সাংবাদিক জিনিয়া বহিষ্কার হবে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান কাজ কি’ এই প্রশ্ন করায়, ছাত্রলীগ ২ কোটি টাকার তহবিল পাবে, অবৈধ নিয়োগ চলতেই থাকবে আর সাধারন ছাত্ররা পরে পরে মার খাবে।

লেখক : প্রাক্তন যুগ্ন আহ্বায়ক জাহাঙ্গীরনগর সাংস্কৃতিক জোট, প্রাক্তন আহ্বায়ক চারন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Check Also

নতুন সভাপতি-সম্পাদক পেলো ছাত্রদল

নিউজ ডেস্ক: জাতীয়াতাবাদী ছাত্রদলের ষষ্ঠ কাউন্সিলে সভাপতি পদে ফজলুর রহমান খোকন ও সাধারণ সম্পাদক পদে …

%d bloggers like this: