Home / দেশজুড়ে / তামাকের নিচে ঢাকা তিস্তার বালুচর

তামাকের নিচে ঢাকা তিস্তার বালুচর

দেশজুড়ে ডেস্ক: সারাদিন তামাকের কাম করায় হাতে কস (আঠালো পদার্থের প্রলেপ) নাগে। ভালো করি হাত ধুইলেও তা যায় না।

ভাতের স্বাদ ‘তিতা’ নাগে। তয় কী আর করমো, প্যাটে খাইলেতো কাম করায় নাগবে। কয়দিন পরেতা আর তামাক থাইকপার নয়।’

রংপুরের গঙ্গাচড়ায় তিস্তার চরে তামাকের পাতা উত্তোলনের পর শুকানোর জন্য বাঁশের কাঠিতে ফোঁড়ানোর সময় এমন কথা বলেন ইছলি চরের জোসনা খাতুন। তার মতো এখন পরিবারের সদস্যদের নিয়ে রবি মৌসুমে চাষকৃত তামাকের পাতা উত্তোলনে ব্যস্ত সময় কাটছে চরাঞ্চলের মানুষের।

বিকল্প ফসল হিসেবে রংপুরে চলতি বছর ৫০ হাজার হেক্টরের বেশি জমিতে আলু চাষ হলেও কমেনি ক্ষতিকর তামাকের আবাদ।

বিকল্প ফসল উৎপাদনে বীজ প্রাপ্তিতে জটিলতা, উৎপাদন খরচ বেশি, উৎপাদিত পন্যের ন্যায্যমূল্য না পাওয়াসহ সংরক্ষণ সুবিধা না থাকায় তামাক চাষের প্রতি চাষিদের দুর্বলতা রয়েই গেছে।

তার ওপর তামাক সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো ঋণ দিয়ে চাষিদের উদ্বুদ্ধ করছেন। পরিণতিতে সরকারের নিরুৎসাহিতকরণ সত্বেও রংপুরের চাষিরা তামাক চাষ ছাড়ছেন না।

অনুসন্ধানে জানা যায়, এক সময়ে তামাকই ছিল রংপুর অঞ্চলের প্রধান ফসল। তামাক সংশ্লিষ্ট দেশের বড় বড় প্রতিষ্ঠানের কাছে এখানকার ভার্জিনিয়া জাতের তামাকের কদর ছিল প্রচুর।

তামাককে ঘিরে এ অঞ্চলের ব্যবসায়ীরা দেশব্যাপী বিশাল নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিলেন। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা বিনা পুঁজিতে তামাকের ব্যবসা করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতেন।

সে সময় বিড়ি, সিগারেট, গুল, জর্দাসহ তামাক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে এ অঞ্চলে। এলাকার চাষিদের প্রয়োজনকে সামনে রেখেই তদানিন্তন বৃটিশ সরকারের সার্ভে অনুযায়ী ১৯০৮ সালে রংপুরের বুড়িরহাটে স্থাপিত হয় তামাক গবেষণা কেন্দ্র।

প্রতিষ্ঠানটি সে সময়ে দেশের ভিতর এবং বিদেশ থেকে ১১৪টি তামাকের জাত সংগ্রহ করে। এ ছাড়া সুরভি ও সুগন্ধি নামক উচ্চ ফলনশীল দু’টি জাতসহ নতুন নতুন তামাকের জাত উদ্ভাবন করে।

পরবর্তীতে তামাকের ক্ষতিকারক দিক বিবেচনা করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে এর চাষে নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে চাষিদের। এর অংশ হিসেবে এক সময় তামাক ক্রয়ের বৃহৎ প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ টোব্যাকো কম্পানির (বিটিসি) রংপুর ডিপো বন্ধ হয়ে যায়।

তামাক গবেষণা কেন্দ্রটি রূপ পাল্টে পরিণত হয় কৃষি গবেষণা কেন্দ্রে। ১৯৮৫ সাল থেকে প্রতিষ্ঠানটি বিকল্প হিসেবে ভূট্টা, সূর্যমূখী, সরিষা, বাদামসহ শাকসব্জি চাষ করে চাষিরা যাতে তামাকের চেয়ে বেশি লাভ পেতে পারে সে বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছে। তারপরও ক্ষতিকর তামাকের চাষ বন্ধ হয়নি।

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, রংপুর জেলায় এ বছর প্রায় তিন হাজার হেক্টর জমিতে তামাকের চাষ হয়েছে। যদিও বাস্তবে এর পরিমাণ অনেক বেশি।

এরমধ্যে সর্বোচ্চ প্রায় এক হাজার হেক্টর জমিতে ক্ষতিকর এই তামাকের চাষ হয়েছে গঙ্গাচড়া উপজেলায়। এ ছাড়াও রংপুর সদর, তারাগঞ্জ, বদরগঞ্জ এবং কাউনিয়া উপজেলায় ব্যাপক তামাকের চাষ করা হয়েছে।

এর কারণ হিসেবে সুত্র জানায়, বাপ-দাদার আমল থেকে তামাক চাষ করায় এর উৎপাদন কৌশল চাষিদের জানা। খুব সহজে বাড়িতে এর বীজ সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা যায়। উৎপাদিত তামাক সংরক্ষণেও কোনো সমস্যা হয় না এবং অন্যান্য ফসলের তুলনায় দামও বেশি পাওয়া যায়। তাছাড়া তামাক সংশ্লিষ্ট কম্পানিগুলো ঋণদানসহ তামাক কেনার নিশ্চয়তা দেওয়ায় চাষিরা তামাক চাষ ছাড়ছেন না।

সরেজমিনে তামাক নির্ভর এলাকা বলে পরিচিত গঙ্গাচড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, রবি মৌসুমের ফসল হিসেবে ব্যাপক এলাকায় আলু চাষ হলেও তামাক চাষে এর কোনো প্রভাব পড়েনি। যে দিকে চোখ যায়, তামাক আর তামাক। বিশেষ করে তিস্তার বালুচর যেন তামাকের নিচে ঢাকা পড়েছে। চাষিদের ব্যস্ত সময় কাটছে তামাকের ক্ষেতে সেচ প্রদান, পাতা সংগ্রহ ও শুকানোর কাজে। শংকরদহ ও ইছলি চরে যাওয়ার পথে মহিপুর ঘাটে নৌকায় ওঠার সময় মাঝিসহ স্থানীয় লোকজন প্রশ্ন করেন, তামাকের চর যাইমেন বাহে? অর্থাৎ তিস্তার চর যেন পরিণত হয়েছে তামাকের চরে।

কলাগাছি চরে তামাক চাষি আব্দুল বাতেন জানান, তামাক আবাদই তাদের একমাত্র ভরসা। সারা বছর অপেক্ষায় থাকেন কখন তামাকের মৌসুম আসে। তামাকের আঠা খুব তিতা। একদিন তামাকের কাজ করলে অন্তত দুইদিন ঠিকমত ভাত খাওয়া যায় না, তিতা লাগে। তবে তামাক চাষে লাভ হওয়ায় তা মেনে নিতে বাধ্য হওয়া লাগে।

তামাক ক্ষেতে কর্মরত একই এলাকার সাদেকুল ইসলাম বলেন, ‘বিকল্প ফসল হিসেবে আলু আবাদে অনেক টাকা লাগে। তাছাড়া তামাক চাষ করলে ঋণও পাওয়া যায়।’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বিভিন্ন বিড়ি ফ্যাক্টরির তামাক ক্রয় এবং প্রসেসিং কেন্দ্রের আওয়ায় তিস্তার চরাঞ্চলসহ গঙ্গাচড়ায় কৃষকদের উদ্বুদ্ধসহ তামাক চাষে ঋণ দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তরা জানান, সরকারতো তামাক চাষ বন্ধ করেনি! চাষিরা যেখানে বেশি লাভ পাবে সেখানেই যাবে। তবে ক্ষতিকর তামাক চাষে চাষিদের নিরুৎসাহিত করা হচ্ছে।

Check Also

নন্দিপাড়ায় একই পরিবারের ৬ জন করোনায় আক্রান্ত

নিউজ ডেস্কঃ ঢাকার মাদারটেক নন্দিপাড়ায় একই পরিবারের সবাই করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। পরে বাসাটি পুলিশ লকডাউন …

%d bloggers like this: