Home / জাতীয় / শ্রমিক ও কৃষি উপকরণ সংকটে আমে বিপর্যয়ের শঙ্কা

শ্রমিক ও কৃষি উপকরণ সংকটে আমে বিপর্যয়ের শঙ্কা

নিউজ ডেস্কঃ রাজশাহীর আম, বিশ্বজোড়া তার নাম। এ অঞ্চলের আম স্বাদে ও গন্ধে অতুলনীয়। আমের মুকুল আসা থেকে শুরু করে গাছ থেকে নামানো পর্যন্ত এ অঞ্চলে প্রায় ছয় মাস ধরে চলে বিশাল কর্মযজ্ঞ। আমের মৌসুমে কয়েক লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের হয়। ত্বরান্বিত হয় অর্থনৈতিক গতিপ্রবাহ।

কিন্তু চলতি মৌসুমে শুরুতেই বৈরি আবহাওয়া এবং প্রাণঘাতি করোনার ভয়াল থাবায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন আমচাষীরা। তারা দুঃস্বপ্নের মধ‌্যে আছেন। বাগানগুলোতে বেশিরভাগ আম গাছেই গুটি এসেছে। অন্য মৌসুমে আমচাষীরা গুটিতেই স্বপ্ন দেখা শুরু করেন। কিন্তু চলতি মৌসুমে গুটিতেই আমচাষীর সে স্বপ্ন ফিকে হতে শুরু করেছে।

করোনা প্রতিরোধের কারণে চলা লকডাউনে কার্যত দেশ অচল। রাজশাহীও এর বাইরে নয়। এ অঞ্চলের প্রতিটি এলাকাতেই দেখা দিয়েছে শ্রমিক সঙ্কট। স্থানীয় বাজারে দোকানপাট বন্ধ থাকছে। ফলে মিলছে না চাহিদা অনুযায়ী সার ও কীটনাশক। এছাড়া মৌসুমের শুরু থেকেই আমগাছের পাতা ক্ষতিকর মিজ ও হপার পোকার আক্রমণের শিকার হয়েছে। সবমিলিয়ে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে গাছের পরিচর্যা নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন আমের রাজধানী খ্যাত রাজশাহীর চাষীরা।

রাজশাহী কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রাজশাহী জেলায় ১৭ হাজার ৫৭৪ হেক্টর জমিতে আমবাগান রয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৯৩ হাজার ৭৮ মেট্রিক টন। গত মৌসুমে লক্ষ্যমাত্রা ছিল দুই লাখ ১৩ হাজার ৪২৬ মেট্রিক টন। কিন্তু চলতি মৌসুমে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ হবে কী না- তা নিয়ে দেখা দিয়েছে সংশয়।

ফল গবেষক ও কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, চলতি মৌসুমে অধিকাংশ গাছে ভালো মুকুল এসেছে। আগাম মুকুল আসা গাছগুলোতে এখন আমের কড়ালি বা গুটি শোভা পাচ্ছে। আর দেরিতে মুকুল আসা গাছে ‘মটরদানা গুটি’। এই দুই পর্যায়েই কীটনাশক স্প্রে করা জরুরি। এর পাশাপাশি পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ার কারণে বর্তমানে গাছের গোড়ায় পানি এবং বিভিন্ন প্রকারের সার দেওয়ার সময়। তা না হলে আমের ফলন বিপর্যয় হতে পারে।

তবে কৃষকরা বলছেন, লকডাউনের চললেও কৃষি উপকরণ সরবরাহ চালু রাখার সরকারি নির্দেশনা স্থানীয়ভাবে মানা হচ্ছে না। সার ও কীটনাশকের দোকানও বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। তবে দেন-দরবার করে কীটনাশক ও সার মিললেও পরিচর্যায় এখন প্রধান প্রতিবন্ধকতা শ্রমিক সঙ্কট।

স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তারা জানান, জেলার নয়টি উপজেলার মধ্যে পুঠিয়া, মোহনপুর, চারঘাট, বাঘা, বাগমারা, মোহনপুর ও পবায় এবার ৮৫ ভাগ আম গাছে ভালো মুকুল এসেছিল। এছাড়া কিছুটা কম হলেও তানোর ও গোদাগাড়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকার আম বাগানগুলোয় গাছে মুকুল ছিল। কিন্তু মুকুল আসার পর থেকে রাজশাহী অঞ্চলে বৃষ্টি হয়নি। ফলে টানা খরায় এখন গুটি ঝরে পড়ছে।

পুঠিয়ার শিলমাড়িয়া এলাকার বড় আমচাষী আবদুস সালাম। তার প্রায় দেড়শ বিঘার কয়েকটি বাগান রয়েছে। তিনি বলেন, ‘মৌসুমের শুরুটা ছিলো ভালো। গাছে মুকুলও এসেছিল প্রচুর। গুটিও টিকেছিল অনেক। কিন্তু গুটি আর গাছে থাকছে না। ব্যাপক হারে ঝরে পড়ছে। একটু বড় হয়ে ওঠা গুটিগুলোতে ছত্রাক লেগে খসে পড়ছে। এছাড়া গাছে প্রচুর পরিমাণে পোকাও রয়েছে। খরার কারণে এমনটি হচ্ছে। এখন বৃষ্টি হলে ভালো হতো। গাছের বেশি পরিচর্যা করা লাগতো না। পাশাপাশি গাছে অবশিষ্ট যে গুটি রয়েছে, তাও টিকে যেত।’

আমচাষী আবদুস সালাম বলেন, ‘কৃষি কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেছি। তারা কয়েকটি কীটনাশকের নাম লিখে দিয়েছেন। তিনদিন পর পর স্প্রে করতে হবে। কিন্তু আশেপাশের স্থানীয় বাজারে কীটনাশক পাচ্ছি না। উপজেলা সদরের বাজারে গিয়েও দোকান বন্ধ। দোকান মালিককে ফোন দিয়ে ডেকে নিয়ে কিছু কীটনাশক কিনেছি। কিন্তু এটিও প্রয়োজনের তুলনায় কম। এর পাশাপাশি রয়েছে শ্রমিক সঙ্কট। প্রয়োজন ৩০ জন শ্রমিকের। কিন্তু পাচ্ছি না। নিজে এবং পরিবারের সদস্যদের নিয়েই এখন গাছে স্প্রে করতে হচ্ছে।’

বাঘার আড়ানী পৌরসভা সদরের আমচাষী রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘খরায় গাছ থেকে ব্যাপকহারে গুটি ঝরে যাচ্ছে। বাগানে সেচ দিচ্ছি, সারও দিয়েছি। কিন্তু স্প্রে করার শ্রমিক মিলছে না। গুটি ঝরা বন্ধ না হলে ফলন ভালো হবে না। বাগান ইজারার টাকাও উঠবে না। এ মৌসুমে মূলধন হারানোর আশঙ্কা করছি।’

মোহনপুরের কেশরহাট এলাকার আমচাষী হাবিব আহমেদ জানান, করোনা প্রতিরোধে স্থানীয় প্রশাসন বাজারের সব দোকানই বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। ফলে কৃষি উপকরণ সংকটে পড়েছেন আমচাষীরা। আম গাছের গুটি ঝরে যাচ্ছে। যত্ন নিতে পারছেন না।

চারঘাট সদরের আমচাষী আবুল হোসেন জানান, করোনা ভাইরাসের কারণে শ্রমিক সঙ্কট রয়েছে। বড় বাগানে একসঙ্গে ১২/১৫ জন মিলে কাজ করতে হয়। এটি করা এখন সম্ভব হচ্ছে না। সার-কীটনাশক পাওয়া গেলেও তা খুব কম। ফলে বাগান পরিচর্যা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন আমচাষীরা।

রাজশাহী ফল গবেষণা কেন্দ্রের গবেষক ড. আলীম উদ্দিন বলেন, ‘খরার কারণে গুটি ঝরে পড়া, পোকা ও ছত্রাক হওয়ার শঙ্কা থাকে। প্রতিকূল আবহাওয়ার সময়ে পরিচর্যা বেশি প্রয়োজন। এখন গুটি ও পাতায় স্প্রে এবং গাছের গোড়ায় সার ও পানি দিতে হবে।’

তিনি বলেন, ‘আমচাষীরা প্রায়ই ফোন করে বিভিন্ন সমস্যার কথা জানাচ্ছেন। আমরা তাদেরকে মোবাইলে পরামর্শ দিচ্ছি। সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী সার ও কীটনাশকসহ কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত রাখার কথা। সেটার ব্যত্যয় ঘটলে স্থানীয় প্রশাসনকে বিষয়টি অবগত করতে আমরা আমচাষীদের পরামর্শ দিচ্ছি।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রাজশাহীর উপপরিচালক শামছুল হক বলেন, ‘জেলায় কৃষি উপকরণ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে আমচাষীরা যদি সার ও কীটনাশক না পেয়ে থাকেন, তবে স্থানীয় কৃষি কর্মকর্তা বা জেলা অফিসেও মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করতে পারেন। আমরা কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করব। এছাড়া বর্তমানে আমচাষীরা যে সংকটে রয়েছেন, তার উত্তোরণ ঘটবে বলে আমরা আশাবাদী।’

 

Check Also

রাতে জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) …

%d bloggers like this: