Home / ধর্ম / বিজ্ঞান ও ধর্মগ্রন্থসমূহে করোনাভাবনা

বিজ্ঞান ও ধর্মগ্রন্থসমূহে করোনাভাবনা

নিউজ ডেস্ক: কোনো সন্ত্রাসী বা জঙ্গিগোষ্ঠী নয়। পারমাণবিক বোমার হুমকি নয়। পৃথিবীব্যাপী একটাই ত্রাস, করোনাভাইরাস। সারা বিশ্বের ঘুম কেড়ে নিয়েছে করোনাভাইরাস। মৃত্যুর সংখ্যা আড়াই লাখ ছাড়িয়েছে। করোনার উৎস নিয়ে বিজ্ঞানীমহলে ও ধর্মবিশারদদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে। এক দল বিজ্ঞানীর মতে, বন্য প্রাণীর শরীর থেকেই এই ভাইরাস মানুষের শরীরে ছড়িয়ে পড়েছে। কিন্তু এই বন্য প্রাণী কী হতে পারে—তা নিয়ে মতবিরোধ রয়েছে। বেশির ভাগ বিজ্ঞানীর ধারণা, নয়া করোনাভাইরাস অর্থাৎ কভিড-১৯ এসেছে বাদুড় থেকে। আবার অনেকের অভিমত হলো, শুধু বাদুড় নয়; প্যাঙ্গোলিনও এই ভাইরাসের অন্যতম বাহক। তাদের যুক্তি মানুষের জীবনযাত্রার পরিবর্তন, বন্য প্রাণীদের আরো কাছাকাছি চলে আসা, জঙ্গল ধ্বংস করে নগরসভ্যতার বিকাশ, খাদ্যাভ্যাসে বদল এসব কারণে মানুষ সংক্রামক ভাইরাসগুলোর আরো কাছাকাছি চলে আসায় বিপত্তি ঘটছে। সচেতনতার অভাব ও অসংযমী জীবনযাত্রাই এই মহামারির অন্যতম বড় কারণ। আরেক দল বলছে, এটি ল্যাবরেটরি থেকে ছড়িয়েছে। ল্যাবরেটরি থেকে ছড়ানোর পক্ষে যারা তাদের মধ্যে আবার দুই দল। এক দল মনে করে, ভাইরাস নিয়ে গবেষণায় এটি দুর্ঘটনাবশত ছড়িয়েছে। আরেক দল মনে করে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতাধর হতে ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো হয়েছে।

ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে যাঁরা ব্যাখ্যা করছেন তাঁরা বলছেন, করোনা মহামারি স্রষ্টার নির্দেশনা অমান্য করার শাস্তি ও সতর্কতা, মানুষ যাতে স্রষ্টার নির্দেশিত পথে জীবন যাপন করে। ইসলাম ধর্মের অনুসারীদের মতে, মহামারি আল্লাহর শাস্তি ও সতর্কবার্তা। এ বিষয়ে পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘মানুষের কৃতকর্মের ফলে স্থলে ও সমুদ্রে বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ে; যার ফলে তাদের কৃতকর্মের কোনো কোনো কর্মের শাস্তি তাদের তিনি আস্বাদন করান, যাতে তারা ফিরে আসে।’ (সুরা রুম, আয়াত : ৪১)

পবিত্র কোরআনের দুটি সুরায় মহামারির কথা এসেছে। প্রথমটি সুরা বাকারার ২৪৩ নম্বর আয়াতে। এখানে উল্লেখ রয়েছে, বনি ইসরাঈলের একটি দলের মাঝে মহামারি দেখা দিয়েছিল। আল্লাহর নির্দেশ ছিল মৃত্যুভয়ে পলায়ন না করার। কিন্তু তারা পালিয়ে নিজেদের দেশ ছেড়ে অন্যত্র চলে গিয়েছিল। দুই পাহাড়ের মাঝে একটি উপত্যকায় তারা সমবেতভাবে পালিয়ে এসেছিল। আল্লাহ তাদের সবাইকে একসঙ্গে মৃত্যু দেন। কোরআনের ভাষায়, ‘তুমি কি তাদের দেখোনি, মৃত্যুভয়ে তাদের হাজার হাজার মানুষ আপন ঘরবাড়ি পরিত্যাগ করেছিল? অতঃপর আল্লাহ তাদের বলেছিলেন, তোমাদের মৃত্যু হোক। পরে তাদের জীবিত করলেন। নিশ্চয়ই, আল্লাহ মানুষের প্রতি অনুগ্রহশীল; কিন্তু বেশির ভাগ লোক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে না।’

অন্যদিকে সুরা আরাফে আছে, মিসরের কিবতিদের আল্লাহ মহামারি দিয়েছিলেন। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘অতঃপর আমি তাদের প্লাবন, পঙ্গপাল, উকুন, ব্যাঙ ও রক্ত দ্বারা ক্লিষ্ট করি। এগুলো স্পষ্ট নিদর্শন; কিন্তু তারা দাম্ভিকই রয়ে গেল, আর তারা ছিল এক অপরাধী সম্প্রদায়।’ (সুরা আরাফ, আয়াত : ১৩৩) হিন্দু ধর্মের অনুসারীদের দাবি হলো, করোনাভাইরাসই শুধু নয়, এরপরও যদি কোনো বিপদ পৃথিবীতে আসার থাকে, তাও রয়েছে ভারতের পুরাণে! তেমনই একটি হলো নারদ সংহিতা। নারদ সংহিতায় রয়েছে, ২০১৯ সালে বছরের শেষ সূর্যগ্রহণের পরই পৃথিবীতে দেখা দেবে মহামারি। মারণ অসুখ ছড়িয়ে পড়বে। সংহিতা বলছে, যে বছরে গ্রহের অধিপতি শনি থাকবে, সেই বছর থেকেই মহামারি ছড়াবে। বাস্তবিকই যেদিন চীনের উহানে প্রথম করোনা আক্রান্তের খোঁজ মেলে, সেদিন অর্থাৎ ২০১৯-এর ২৬ ডিসেম্বর পূরভদ্র নক্ষত্র সামনে এসেছিল। অল ইন্ডিয়া হিন্দু মহাসভার সভাপতি স্বামী চক্রপাণি এই ভাইরাসকে একটি ‘রাগী দেবতা’ বলে অভিহিত করেছেন।

খ্রিস্ট ধর্মের অনুসারীরা বিশ্বাস করে, পৃথিবী ধ্বংসের শেষদিকে ধরিত্রীতে যিশুর পুনরায় অগমনের আগে করোনাভাইরাসের মতো মহামারি দেখা দেবে। তারা বলেন  New Testament-এ উল্লেখ রয়েছে, ‘Nation will rise against nation, and kingdom against kingdom. There will be great earthquakes, and in various places famines and pestilences. And there will be terrors and great signs from heaven.’ (Matthew 24 : 11-12)

অর্থাৎ পৃথিবী ধ্বংসের আগে চিহ্নগুলো হল জাতি ও রাষ্ট্রসমূহ যুদ্ধে লিপ্ত হবে। মারাত্মক ভূমিকম্প, দুর্ভিক্ষ, মহামারি দেখা দেবে। আসমান থেকে ভীতিকর ও বড় আলামত নেমে আসবে।

ইহুদিরা তাদের ধর্মগ্রন্থ

Torah, Talmud, Ges Midrash-এর উদাহরণ টেনে বলে, স্রষ্টা কখনো কখনো প্রাকৃতিকে ব্যবহার করেন আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে, যাতে আমরা তাঁর পথে ফিরে আসি। ইহুদিদের দাবি, ২৬০০ বছর আগে তাদের ধর্মগ্রন্থে মহামারির উল্লেখ রয়েছে,

Go, my people, enter your rooms and shut your doors behind you. Hide yourselves a little while until the wrath has passed. (Isaiah 26:20)  অর্থাৎ হে লোকসকল! স্রষ্টার ক্রোধ নেমে এলে কক্ষে প্রবেশ করে দরজা বন্ধ করো। নিজেকে লুকিয়ে রাখো, যতক্ষণ না স্রষ্টা তাঁর ক্রোধ উঠিয়ে নেন।

Torah পণ্ডিতরা মনে করেন, ‘ব্যাপক অর্থনৈতিক বিপর্যয়, গণহত্যা, সুনামি ও করোনাভাইরাস মহামারি ইহুদিদের মসিহর (অবতার) আগমনের সন্নিকট বার্তা। এটি ইহুদি পঞ্জিকার হিসাবে ৬০০০ সনে সংঘটিত হবে এবং বর্তমানে ৫৭৮০ ইহুদি সন চলছে।’

বৌদ্ধ ধর্মে মহামতি গৌতমবুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণীসমূহে অনাবৃষ্টি, প্রাকৃতিক বিপর্যয়, রাষ্ট্র-সমাজে নৈতিকতার অবক্ষয়, নীতিহীনদের শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়া ইত্যাদি উল্লেখ থাকলেও মহামারির বিষয়ে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী আমি পাইনি।

প্রধান ধর্মসমূহ পর্যালোচনা করে বলা যায়, মহামারি ও অন্য বিপদাপদ মানুষের পাপের ফসল। সে হিসেবে করোনাভাইরাস মহামারিও আমাদের গুনাহ ও অন্যায়ের ফসল। মানুষ যখন বেপরোয়াভাবে গুনাহ করে, স্রষ্টা তাকে সতর্ক করতে মহামারিসহ বিভিন্ন পরীক্ষায় ফেলেন। যেন সে গুনাহ থেকে নিবৃত্ত হয়। লক্ষ্যণীয় যে, মুসলিম, হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ, ইহুদি, নারী-পুরুষ, শিশু-যুবক-বৃদ্ধ, শ্বেতাঙ্গ-অশ্বেতাঙ্গ এবং সব মহাদেশের মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছে এবং আড়াই লাখের অধিক মানুষ মারা গেছে। ধর্মবিশ্বাসী মানুষের পাশাপশি ধর্ম ও স্রষ্টায় বিশ্বাসী নয়, এমন মানুষও আক্রান্ত হয়েছে, মৃত্যুবরণ করেছে। কলামে কোনো নাস্তিকের সুনির্দিষ্ট নাম উল্লেখ করছি না। তবে একটি জরিপের উদ্ধৃতি উল্লেখ করছি। সম্প্রতি Gallup International পৃথিবীর ৬৮টি দেশে জরিপ চালিয়ে দেখেছে, চীনে সর্বোচ্চ ৬৭ শতাংশ মানুষ ধর্মে বিশ্বাস করে না। অন্যদিকে ৬৮টি দেশের ৬২ শতাংশ মানুষ ধার্মিক, ৭৪ শতাংশ বিশ্বাস করে আত্মা আছে, ৭১ শতাংশ বিশ্বাস করে স্রষ্টা আছেন, ৫৬ শতাংশ স্বর্গ ও ৪৯ শতাংশ নরকের অস্বিত্বে বিশ্বাস করে। মাত্র ৫৪ শতাংশ বিশ্বাস করে মৃত্যুর পরে পুনরুত্থান আছে এবং সে জীবনে পাপ-পুণ্যের বিচার হবে। ৫ মে পর্যন্ত যে ৩৬ লাখ ৪৩ হাজার ২০৯ জন করোনায় আক্রান্ত হয়েছে, দুই লাখ ৫২ হাজার ২৩৭ জন মৃত্যুবরণ করেছে এবং ১১ লাখ ৯৪ হাজার ৪৬৮ জন সুস্থ হয়েছে তাদের মধ্যে নিশ্চয়ই ধর্ম-স্রষ্টায় অবিশ্বাসীও রয়েছে। তার মানে করোনা এই বার্তা দিচ্ছে যে ধর্ম যে কয়টি থাকুক, অবিশ্বাসীর সংখ্যা যাই হোক স্রষ্টা একজনই। ৭৮০ কোটি মানুষের মধ্যে আক্রান্ত, সুস্থ হওয়া ও মৃত মিলিয়ে এযাবৎকালে অর্ধকোটির বেশি মানুষের ভাগ্য নির্ধারণ করছেন যে স্রষ্টা তিনি একজনই। যদি একাধিক স্রষ্টা থাকত, তাহলে সবাই একসঙ্গে কেন ক্রুদ্ধ হলেন? একসঙ্গে কেন নিজ নিজ ধর্মের অনুসারীদের শাস্তি দিলেন, সতর্কবার্তা পাঠালেন? কোনো স্রষ্টা তো এমন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন যে তাঁর ধর্মের অনুসারীদের এখন শাস্তি দেবেন না। কিংবা সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন শাস্তি হিসেবে কেবল করোনায় আক্রান্ত হবে; কিন্তু মৃত্যু হবে না। এমন হলে তো মর্তে দলে দলে মানুষ সে স্রষ্টার ধর্মে দীক্ষিত হতে পারত। আর ওই স্রষ্টার অনুসারীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বাড়তে পারত। কিন্তু তা হয়নি। স্রষ্টা একজন, তাই সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রতিযোগিতা হয়নি। একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন সিদ্ধান্ত হয়নি।

আসমানের ‘স্রষ্টাদের’ মধ্যে যদি বিদ্বেষ না থাকে, বরং সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও সমন্বয়ের বন্ধন থাকে, তাহলে আমরা পৃথিবীতে কোন স্রষ্টাকে খুশি করতে জীবিকা মন্দির, গির্জা, মসজিদ, সিনাগগকে অবমাননা, ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ করি? স্রষ্টার সৌহার্দ্যের নীতির বিরুদ্ধে গিয়ে অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি সহিংসতা, বিদ্বেষ, সন্ত্রাস করে আমি কি নিজেকে ধার্মিক দাবি করতে পারব?

আসুন, করোনকালে মানবতার এ বিরুদ্ধ সময়ে প্রতিজ্ঞা করি, অন্য ধর্মের মানুষের প্রতি আর কোনো বিদ্বেষ নয়। বরং স্রষ্টার ভালোবাসা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্যের নীতি ও আদর্শে নিজেকে রঞ্জিত করি।

লেখক, মো. জাকির হোসেন

অধ্যাপক, আইন বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

zhossain1965@gmail.com

উৎস: কালের কণ্ঠ

রোজায় বদহজম? রেহাই পাবেন এ উপায়ে …

Check Also

নড়াইলের ভাগ্যবিড়ম্বিত ভূমিপুত্র কমল দাশগুপ্তঃ চরম অবহেলিত ও উপেক্ষিত সঙ্গীত প্রতিভা!!

উজ্জ্বল রায়: নড়াইলের কালিয়ার বেন্দা গ্রামের ভাগ্যহত সন্তান কমল দাশগুপ্ত। জন্মেছিলেন ১৯১২ সালের ২৮ জুলাই …

%d bloggers like this: