Home / ফিচার / ‘নারী’ রোবট যখন সৌদি নাগরিক

‘নারী’ রোবট যখন সৌদি নাগরিক

ফিচার ডেস্ক: সৌদি আরব রোবট নারীকে নাগরিকত্ব দিয়েছে। চমকে যাবার মতো ঘটনাই বটে। যে দেশের নারীরাই ঠিকমতো ভোটাধিকার পায় না। পুরুষ সঙ্গীছাড়া একা বাড়ী থেকে বের হতে পারে না, গাড়ী চালানোর অনুমতি এই সেদিন মিললো কিন্তু এখনও কার্যকর হয়নি; সেইসময় এ ঘটনা সবাইকে ভীষণভাবে নাড়া দিয়েছে। যে দেশের অভিবাসি শ্রমজীবি মানুষ জীবনভর কাজ করেও নাগরিকত্ব পায়না। যে-পৃথিবীতে বিপুল সংখ্যক শরনার্থী সমুদ্রের পানিতে ভেসে বেড়ায় কোনো দেশের মাটিতে তাদের জায়গা হবে না বলে শাসকের দম্ভোক্তি শুনি সেখানে এখনও অপরিপক্ক অ্যান্ড্রয়েড রোবটের নাগরিকত্ব ভারসাম্যহীন এক বিপদজনক পৃথিবীর কথাই বলে। তবে এ ঘটনা বলছে, রোবট পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়বে। কয়েক দশক আগে থেকে একটা ভবিষ্যদ্বাণীতো আছেই ২০২০ সালেই প্রত্যেক ঘরে একটি করে রোবট থাকবে। রোবট শ্বব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে মানবসদৃশ কোনো যন্ত্র। মনের কল্পনায় আমরা হয়তো দেখি যন্ত্রটি হেঁটে চলছে কিংবা কথাও বলছে। বাংলাদেশও এই রোবট যুগে প্রবেশ করেছে।

এ কথার মানে এই নয় যে রোবটরা হেটে চলে বেড়াচ্ছে। তবে বাংলাদেশের তরুণরা বেশ ভালোভাবেই রোবট নিয়ে কাজ করছে। রোবট শ্বব্দটির উৎপত্তি চেক শব্দ ‘রোবটা’ থেকে, যার অর্থ ফোর্সড লেবার বা মানুষের দাসত্ব কিংবা এক ঘেয়েমি খাটুনি বা পরিশ্রম করতে পারে এমন যন্ত্র। বর্তমানে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে রোবট ব্যবহার করা হচ্ছে। আই রোবট, বাইসেন্টিনিয়াল ম্যান থেকেও আমরা ধারণা করতে পারি। কিন্তু একটি রোবটকে নাগরিকত্ব দেওয়ার ক্ষেত্র এখনও প্রস্তুত নয়। না প্রযুক্তিক জায়গা থেকে, না মানবিক জায়গা থেকে। যদিও আইজ্যাক আসিমভের গল্প অবলম্বনে ত্রক্রাইস কলামবাস এর পরিচালনায় বাইসেন্টিনিয়াল ম্যান ছবিতে মূল নায়ক ছিলেন এক রোবট। তিনি ছিলেন একজন গৃহকর্মী রোবট। মানুষের সুখদুঃখের ক্ষমতা অর্জনের পরও ১৫০ বছর সময় লেগেছিল নাগরিকত্ব অর্জনের স্বীকৃতি পেতে। সে কাহিনীর দৃশ্যায়ন দেখলে চোখে পানি আটকে রাখা দায়।

আই রোবট নামে আরেকটি ছবি আছে। এটি রোবটদের অধিকার ও সৃজনশীলতা নিয়ে কথা বলেছে। এছাড়াও স্ট্যানলি কুবরিকের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করতে গিয়ে বিশ্বখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা স্টিফেন স্পিলবার্গ বানিয়েছেন দুনিয়া কাঁপানো ছবি- আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা। মানবরূপী কিশোর রোবটের গল্পটি। রোবট কিশোর ও রক্তমাংসের মায়ের মধ্যে মমতা ও ভালোবাসার প্রকাশ হচ্ছে এ ছবির মূল প্রতিপাদ্য। এই যান্ত্রিক কিশোরের মায়ের প্রতি গভীর ভালোবাসা দর্শকদের কাঁদিয়েছে। কিশোরটিকে আর রোবট লাগেনি। রক্তমাংসের মানুষের মতোই মনে হয়েছে।

যদিও বেশির ভাগ রোবটের গল্পে দেখা যায় রোবট মানুষের ক্ষমতা কেড়ে নিয়ে পৃথিবী দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। এটা এক ধরনের অসুস্থ চিন্তা ভাবনার প্রকাশ। মানুষের মস্তিষ্কের অসংগতিপূর্ণ বিন্যাসই এর কারণ। কেননা রোবটকে বানানো হয়েছে মানুষকে সহযোগিতা করার জন্য। আর কোনো স্বয়ং সম্পূর্ণ ব্যবস্থার টিকে থাকার সংগ্রাম আর স্বপ্ন দেখার ক্ষমতা না থাকলে বিকশিত করা সম্ভব নয়। সেক্ষেত্রে রোবট ব্যবস্থাকে বলা যায় মানবিকতা সম্প্রসারণের আরেকটি প্ল্যাটফর্ম। তবে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের সুচনাকারী রোবটশিল্প যদি শুধুই লাভ ক্ষতি এবং উদ্দেশ্য হাসিলের হাতিয়ার হয়ে পড়ে তাহলে মানবজাতির ধ্বংস অবশ্যম্ভাবী।

রোবটের সঙ্গে আমার পরিচয় ঘটে গত শতকের আটাত্তর সালে শৈশবে। মা আমাদের দু’ভাইকে (আরেকজন হচ্ছেন কবি আরিফ বুলবুল) দুটো বই কিনে দেন। তার একটি ছিল মুহাম্মাদ জাফর ইকবালের কপোট্রনিক সুখদুঃখ। বইটিতে রোবটদের কথা এমনভাবে বর্ণনা করেছিলেন লেখক যা আমাদের অভিভুত করেছিল। তারপর পরে আরও অনেক বই পড়া হয়। জানতে পারি আর্থার সি ক্লার্কের স্টেক্সস অডিসির কল্ফিক্সউটার হ্যালের কথা; যাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জগতের প্রথম বিশ্বাসঘাতক হিসেবে অভিহিত করা হয়। কিন্তু সেটাও ঘটেছে প্রতিবিপরীত যুক্তিবোধের ব্যবহারে হ্যালের  লজিক সার্কিট তৈরি হয়েছিল, সে কারণে। তা মানুষই করেছিল। এক অর্থে এটা মানুষেরই ভুল ছিল।

রোবট আবিষ্কারের গল্প বেশিদিনের নয়। রোবট আবিষ্কারের ধারণা প্রকাশ করেন সায়েন্স ফিকশনের কিংবদন্তি আইজ্যাক আসিমভ। যোগ্যতা বিবেচনায় অসিমভকে বিজ্ঞান কল্কপ্পকাহিনীর গ্র্যান্ড মাস্টার হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। ১৯৩১ সালের দিকে ডনল আর জনস পরিচালিত মেশিনম্যান নামক একটি গল্পের অনুপ্রেরণায় রচিত হয়েছে আধুনিক যুগের এই রোবট। আসিমভের ফাউন্ডেশন সিরিজের শেষ পর্বে এক নারী রোবট আর চাঁদে ড্যানিলের সঙ্গে পরিচয় আমাকে শিহরিত করে। বহু ভেবেছি এই চরিত্রগুলো নিয়ে। আসিমভের কল্পবিজ্ঞানে রোবট সম্পর্কে অনেক গল্প ও উপন্যাস লিখেছেন তিনি। সেগুলো হচ্ছে, – আই. রোবট (১৯৫০), দ্য কমপ্লিট রোবট (১৯৮২) রোবট ড্রিমস (১৯৮৬), রোবট ভিশনস (১৯৯০), দ্য পজিট্রনিক ম্যান (১৯৯২)। রোবট উপন্যাসগুলো হল দ্য কেভস অব স্টিল (১৯৫৪), দ্য ন্যাকেড সান (১৯৫৭), দ্য রোবট অব ডন (১৯৮৩), রোবটস অ্যান্ড এম্পায়ার (১৯৮৫)।

কল্পবিজ্ঞানের লেখকদেরতো এটা বড়ো শক্তি, অনেকের আগেই তারা বুঝতে পারেন পৃথিবীর গতিপ্রকৃতি। তাই কেমন যেন তাদের লেখা মানুষকে এক ধরনের পূর্ব প্রস্তুতি এনে দেয়। কিন্তু তারপরও এই অ্যান্ড্রয়েড রোবট নারীর আগমন আমাদের হতভম্ব করে দিয়েছে। যতটা না প্রযুক্তির কারণে তার চেয়েও বেশি বিস্ময় বর্তমান যে সামাজিক বাস্তবতায় নাগরিকত্ব দেওয়ার কারণে। সৌদি আরবের রিয়াদে ২৩ অক্টোবর এক প্রদর্শনীতে উপস্থিত শত শত প্রতিনিধি রোবটটি দেখে মুগ্ধ হয়ে রোবট সোফিয়াকে সৌদি নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। অথচ এই সৌদি আরব মুসলিম রোহিঙ্গাদের নিয়ে তেমন কোনো কার্যকর কথা বলেনি। তবে এর সঙ্গে সৌদি আরবে সমতা ভিত্তিক আধুনিক শহরের নির্মাণের উদ্যোগে বোঝা যায় তারা এক ধরনের পরিবর্তনের দিকে যেতে চাচ্ছে। এই ঘটনা হয়তো নারী পুরুষের অধিকারগুলোকে আরো জোরালো করবে।

সৌদি আরবের এই ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা যাইহোক না কেন একটা বিষয় নিশ্চিত যে অ্যান্ড্রয়েড রোবট বিষয়টি মানুষের চোখের সামনে চলে এসেছে। ব্যবসায়ীরাও লাগামহীন ভাবে তা কাজে লাগাবে। কম্পিউটার আর মোবাইলের বাণিজ্যিককরণে কল্পনাতীত যে উন্নতি আমরা দেখেছি তা শুধু স্তম্ভিত করে তাই নয় আমাদের আতঙ্কিতও করে তোলে। কারণ আমরা এক ধরনের সাংস্কৃতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছি। ইতিহাস বলে মানুষ পূর্বের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেয় না। পরে ভয়ঙ্কর প্রায়শ্চিত করে। এ ক্ষেত্রে সতর্ক হওয়ার ওপর নির্ভর করছে পুরো পৃথিবীর ভবিষ্যত।

১৯৪২ সালে আইজাক আসিমভের রান এরাউন্ড গল্পে রবোটিকসের তিনটি শর্তের অবতারণা করেন, যাতে মানবজাতি কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেগুলো হচ্ছে – ১) রোবট কখনোই মানুষের অনিষ্ট করবে না এবং মানুষকে তার ক্ষতি করতে কোনো বাধা দেবে না, ২) রোবট অবশ্যই মানুষের নির্দেশ মেনে চলবে যদি না সেই নির্দেশ তার প্রথম শর্তকে লঙ্ঘন করে, ৩) রোবট সর্বদাই নিজেকে রক্ষা করবে যদি না তা প্রথম ও দ্বিতীয় শর্তকে লঙ্ঘন করে। এই তিনটি  শর্ত পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন কল্কপ্পকাহিনী এবং চলচ্চিত্রে ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু নিজেরা নিজেদের অনিষ্ট করবে না, বা পরস্পরের সঙ্গে সহনশীল অবস্থান রেখে জীবনযাপন করবে সেরকম একটি অবস্থায় এই একাবিংশ অবস্থায়ও আসতে পারেনি।

এর উদাহরণ দেখি মধ্যপ্রাচ্যের পর মিয়ানমারে হত্যা নির্যাতনের মাধ্যমে শুধু গণহত্যাই করেনি ১০ লাখ রোহিঙ্গাকে দেশছাড়া করে শরনার্থি করেছে। কিন্তু এর পিছনে সুনির্দিষ্ট কোনো কারণ আমরা শনাক্ত করতে পারিনি। বৃহৎ ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোও নির্লিপ্ত রয়েছে। আমরা শুধু বুঝতে পারি এর পিছনে বিপুল পরিমাণ কোনো ব্যাবসায়িক লাভক্ষতির ও সুবিধার হিসাব আছে। আর আছে নিজেদের প্রভুত্ত্বকে প্রতিষ্ঠিত করা।

অনেকেই বলে থাকেন এটাতো বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি যুগ। বিজ্ঞানের যুগ হলে কি মানুষ্য নির্মিত জলবায়ু বিপর্যয় হতো। বিজ্ঞানের যুগ হলে কি মাঠহীন ভবিষ্যতের প্রজন্ম বড়ো হতো, বিজ্ঞানের যুগ হলে কি ক্যান্সার ও ডায়াবেটিস এর প্রনোদনা জোগানো খাবারগুলো মানুষের সামনে তুলে ধরা হতো বা এর উপর আমরা নির্ভরশীল হয়ে উঠতাম। এটা হলো বিজ্ঞানের সুবিধা লাভের যুগ। কিভাবে বিজ্ঞানকে ভোগের উপায় হিসেবে ব্যবহার করা যায় তারই যুগ। আরও প্রবলভাবে আত্মধ্বংসের দিকে নিয়ে যাওয়ার যুগ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার্থিদের লাভের মেশিন বানানোর পরিকল্পনার যুগ।

লেখক

এক অর্থে দেখলে শিহরিত হতে হয় যান্ত্রিক প্রযুক্তির যুগ, বিদ্যুৎচুম্বকীয় তরঙ্গের যুগ হয়ে আমরা মহাকর্ষীয় প্রযুক্তির যুগে কেবল প্রবেশ করেছি। তারই সফল নিদর্শন হলো লিগোর আইনস্টাইনের মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তকরণ। মহাকর্ষীয় তরঙ্গকে কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন প্রযুক্তি তৈরি করার যে সংবেদনশীল যন্ত্রপাতি নির্মাণ তা হয়তো শতশত বছরের ব্যাপার কিন্তু কাজটি পৃথিবীর মানুষ শুরু করেছে। ঠিক যেমনভাবে ম্যাক্সওয়েলের বিদ্যুতম্বকীয় তরঙ্গকে ১৮৮৯ সালে হেনরিখ হার্জ শনাক্ত করেছিল। শুরু হয়েছিল বিদ্যুৎচুম্বকীয় প্রযুক্তির যুগ। তাতে বোধের উন্নয়ন ঘটেনি শুধু স্থুল সুবিধার জীবনযাপনকে অবলোকন করেছি।

তবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশে এর নীতিমালা প্রণয়নে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো মনে হয় আগের চেয়ে অনেক সতর্ক। জেনেভায় অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন অন কনভেনশনাল উয়েপনস-এ অংশগ্রহণকারী ১২৩টি দেশ স্বচালিত রোবটের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপেরই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। স্টিফেন হকিং, গুগলের গবেষণা পরিচালক পিটার নরভিগ এবং মাইক্রোসফটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এরিক হরভিৎজসহ সহস্রাধিক শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তি এই সিদ্ধান্তকে কার্যকর করার জোর দাবীও করেছেন। তারা এ ব্যাপারে অগ্রসর হবো কিন্তু আরো ভাবনা চিন্তার বিষয় আছে। চতুর্থ শিল্পবিপ্লব রোবট শিল্প যেন জীবাশ্ম জ্বালানী নির্ভর প্রথম শিল্পবিপ্লবের মতো বিপথগামী না হয়ে পড়ে। কিন্তু সমস্যা হচ্ছে পুঁজি, মুনাফা এগুলো মস্তিষ্কের আদিম প্রবৃত্তির সঙ্গে মিলে যায়; এরমধ্যে নিহীত আছে: আমি শ্রেষ্ঠ, আমিই প্রধান, আমার কথাই সবাইকে শুনতে হবে; যে প্রবণতা আমাদের ষষ্ঠ গণিবিলুপ্তির দিকে নিয়ে যাচ্ছে। এখন সময়ই বলে দেবে মানুষ সবাইকে নিয়ে বাচবে, না পরস্পরের সঙ্গে যুদ্ধ করে নিজেদের ধ্বংস করে দেবে।

Check Also

বিজ্ঞান ও ধর্মগ্রন্থসমূহে করোনাভাবনা

নিউজ ডেস্ক: কোনো সন্ত্রাসী বা জঙ্গিগোষ্ঠী নয়। পারমাণবিক বোমার হুমকি নয়। পৃথিবীব্যাপী একটাই ত্রাস, করোনাভাইরাস। …

%d bloggers like this: