Home / ফিচার / একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস, রাষ্ট্র কী অভিভাবকহীন!

একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁস, রাষ্ট্র কী অভিভাবকহীন!

মো: আনিসুর রহমান: আমাদের দেশে পাবলিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিস্মিত হতে হয় যে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার প্রশ্নপত্রও ফাঁস হয়েছে। সত্যিই সেলুকাস, কি বিচিত্র এই দেশ! পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবারেই প্রথম নয়। বলতে গেলে প্রতিবছরই তা হয়েছে। আশি-নব্বইয়ের দশকেও এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা শোনা যেতো। ওই সময়ে পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে পরীক্ষা বাতিল করে নতুন প্রশ্নে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হতো। অমনটি অবশ্যই কারো কাম্য ছিলো না। কারণ যে প্রস্তুতি নিয়ে একজন পরীক্ষার্থী পরীক্ষা দেয়, প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে যদি তাকে আবার একই পরীক্ষা দ্বিতীয়বার দিতে হয় তাহলে শিক্ষার্থীরা হতাশ হয়ে পরে। এখন প্রশ্নপত্র ফাঁস হলে, পরীক্ষা বাতিল দূরে থাক বরং একে অন্যের ঘাড়ে দোষ চাপানোর সংস্কৃতির চর্চায় লিপ্ত হচ্ছে।

প্রশ্ন জাগে. আগামী দিনে যারা দেশের নেতৃত্ব দিবে সেই তরুণ প্রজন্মকে আমরা কোথায় নিয়ে যাচ্ছি? যে দেশে দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয় সেই দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার কী হাল হতে চলেছে কালবিলম্ব না করে তা নিয়ে এখনই গভীরভাবে ভাবা উচিত।

কেন ঢালাওভাবে সব পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে? কারা এই ফাঁস প্রক্রিয়ার সাথে জড়িত রয়েছে? মূল ফাঁসকারীরা কেন ধরা ছোঁয়ার বাইরে থাকছে? কোথা থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে? মন্ত্রণালয় তথা সরকার কেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের মত অপরাধমূলক তৎপরতা বন্ধ করতে পারছে না। তাহলে কী প্রশ্নপত্র ফাঁস হতেই থাকবে। জাতি কি ক্রমশ ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাবে? কারোই কি কিছুই করার নেই?

আমাদের শিক্ষা বোর্ডের পাঠ্যবই, নতুন শিক্ষা পদ্ধতি অনুসারে রচিত সিলেবাস, পরীক্ষা পদ্ধতি এ সব শিক্ষার্থীদের জন্য কঠিন হয়ে যাচ্ছে কি না তা নিয়ে সরাকারি পর্যায়ে সঠিক গবেষণা হওয়া দরকার বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা কেন দিন দিন লেখাপড়ার প্রতি বিমুখ হয়ে পড়ছে তার উত্তর খুঁজে বের করতে হবে শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের।

মোবাইল ফোন, ট্যাব, নোটবুক, ল্যাপটপ, টেলিভিশন প্রভৃতি এখন মানুষের ঘরে ঘরে বিস্তার লাভ করেছে। শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় মনোযোগ হারিয়ে বা লেখাপড়ার প্রতি তাদের আগ্রহ কমে গিয়ে প্রযুক্তির দিকে ক্রমশ ঝুঁকে পড়ছে। তরুণ শিক্ষার্থীদের মাঝে প্রযুক্তি এমনভাবে প্রভাব ফেলছে যার ফলে তরুণরা খেলাপড়ার আনন্দ হারিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিচ্ছে। তাই প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে সেই অনুযায়ী কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তাহলেই শিক্ষার্থীরা পড়ালেখায় মন ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবে।

একটি জ্ঞানভিত্তিক শিক্ষিত জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে শিক্ষাবীদদের ভূমিকা রাখতে হবে। সন্তানরা যেন প্রশ্নপত্র ফাঁসের অন্বেষণ না করে লেখাপড়ায় মনোনিবেশ করে তার জন্য অভিভাবদের খেয়াল রাখতে হবে। দৈন্দন্দিন কাজকর্মের ভেতরেই সন্তানকে পর্যাপ্ত সময় দিতে হবে। গৃহীণিদের গৃহস্থালী কর্ম শেষ করার পর টিভি সেটের সামনে বসে না থেকে সন্তানদের লেখাপড়ার তদারকি করতে হবে। তাদের দেখভাল সঠিকভাবে করতে হবে। সন্তান লেখাপড়া সঠিক করছে কি না সেদিকে তীক্ষ দৃষ্টি দিতে হবে। পড়ার নাম করে বইয়ের নীচে মোবাইল ফোন নিয়ে গেমস বা বন্ধুদের সাথে চ্যাটিং করছে কি না তা বিশেষভাবে পরখ করতে হবে। যে সকল মায়েরা চাকরি করেন তারাও যতটুকু সময় পান তা সন্তানদের পেছনে ব্যয় করতে হবে। উন্নত বিশে^র দেশগুলোতে অভিভাকবরা তাদের সন্তানদের পেছনে পর্যাপ্ত সময় দেয়। তাই তাদের সন্তানদের মেধা-মননের বিকাশও ভালো হয়।

প্রশ্নপত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা নেওয়ার মূল উদ্দেশ্য শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জন কতটুকু হয়েছে তার পরিমাপ করা এবং একটি ফলাফলের মাধ্যমে তা প্রকাশ করা। কিন্তু আমাদের সন্তানদের মধ্যে আজ কেন জানি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে লেখাপড়ার প্রতি অনীহা দেখা যাচ্ছে। লেখাপড়ায় অমনোযোগী এক শ্রেণির শিক্ষার্থী, অসাধু শিক্ষক, অসচেতন অভিভাবক ও একটি দুষ্ট চক্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস পক্রিয়ার সাথে জড়িত রয়েছে।

যেসকল শিক্ষার্থী ঠিকমত লেখাপড়া করে না, যাদের মা-বাবা উদাসীন তারাই পরীক্ষার পূর্বে প্রশ্নপত্র খুঁজে বেড়ায় অর্থের বিনিময়ে। কিছু কোচিং সেন্টারও এ ব্যাপারে জড়িত। কারণ তাদের ছাত্ররা ভালো করলে সেই কোচিং সেন্টারের এর সুনাম হয়। আর অভিভাবকরা সন্তানের ভালো রেজাল্টের আশায় নাম হয়ে যাওয়া কোচিং সেন্টারে ভর্তি করিয়ে দেন। এই ধরনের ব্যবস্থায় কী মেধাভিত্তিক জাতি গড়ে ওঠতে পারে! সরকার বহুবার কোচিং সেন্টার বন্ধ করার উদ্যোগ গ্রহণ করলেও শেষ পর্যন্ত তা পারেনি। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় একটা সমান্তরাল অবস্থান করে নিয়েছে কোচিং বাণিজ্য।

যারা প্রশ্নপত্র ফাঁস করে চরম অপরাধ করছেন তাদের কাছে অবৈধ্য অর্থ উপার্জনটাই মূখ্য বিষয়। তারা শিক্ষা ব্যবস্থাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে একের পর এক অপকর্ম করে যাচ্ছে। তারা কী আসলেই রাষ্ট্রের চেয়ে বেশি শক্তিশালী! কেন তাদেরকে ধরা যাচ্ছে না। সন্দেহ যাদের করা হচ্ছে কেন তাদের গোয়েন্দা নজরে আনা হচ্ছে না? কেন তারা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে ধ্বংস করতে বসেছে। কী অপরাধ করেছে জাতি তাদের কাছে? এভাবে চলতে থাকলে প্রশ্নপত্র ফাঁসের ভাইরাসে গোটাজাতিই আসক্ত হয়ে পড়বে। আমাদের মেরুদন্ড ভেঙে পড়বে। আমরা বিশ্ব জ্ঞানের প্রতিযোগিতায় ছিটকে পড়বো।

প্রশ্ন ফাঁসকারীকে ধরিয়ে দিলে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করা হলেও বাস্তবে তা ফলপ্রসূ হচ্ছে না। এবারের মত পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা এর আগে কখনো দেখা যায়নি। তাই সমগ্র জাতি সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ভীষণভাবে উদ্বিগ্ন।

প্রশ্নপত্র ফাঁস মূলত জাতিকে ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ঢেলে দিচ্ছে। প্রশ্নপত্র ফাঁস কঠোর হাতে প্রতিরোধ না করা গেলে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা ক্রমশ ধ্বংসের সম্মুখীন হবে। প্রশ্নপত্র ফাঁসের সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুন না কেন তাদের খুঁজে বের করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে যাতে ভবিষ্যতে কেউ এ রকম অপরাধ করার সুযোগ বা সাহস না পায়। এ ধ্বংসের হাত থেকে রক্ষা পেতে হলো যেকোনো মূল্যে প্রশ্নপত্র ফাঁস রোধ করতে সরকারকে সময়োচিত পদক্ষেপ নিতে হবে। উপরন্তু যে জায়গা থেকে অর্থাৎ সরকারি ছাপাখান থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁস হচ্ছে সেখানে র‌্যাব, পুলিশ তথা আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নিয়মিত অবস্থান নিতে হবে। প্রশ্নপত্র ছাপার কাজে প্রয়োজনে সেনাবাহিনীকে যুক্ত রাখা যায় কি না তা-ও ভাবা যেতে পারে।

উদ্বেগের বিষয় হল, প্রশ্ন ফাঁসের মতো একটি অপরাধমূলক কাজের সাথে জড়িতদের চিহ্নিত করতে পারছে না সরকার। এব্যাপরে বিচার বিভাগীয় তদন্ত কমিটি গঠন করে সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিলে রাষ্ট্রই উপকৃত হবে। তাহলে একের পর এক প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা বন্ধ হয়ে যাবে। আর কখনো প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা না-ও ঘটতে পারে। দেশ ও জাতিকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিপদ থেকে মুক্ত করতে হলে সরকারকে বলিষ্ঠ ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ নিতে হবে।

লেখক: কলামিষ্ট ও সাংবাদিক

anis1161967@ gmail.com

Check Also

ফল প্রকাশের এক সপ্তাহ পর একাদশে ভর্তি

নিউজ ডেস্ক:  এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হবে আগামী ৩১ মে। ফলাফল প্রকাশের এক …

%d bloggers like this: