Home / জাতীয় / আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন

আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন

নিউজ ডেস্ক: রাজধানীর পিলখানায় বিডিআর (বর্তমানে বিজিবি) সদর দপ্তরে হত্যাকাণ্ডের মামলার ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড কার্যকরে অনুমতি চেয়ে আবেদন) ও আপিলের রায় পড়া প্রথম দিনের মতো শেষ হয়েছে। আগামীকাল পুনরায় রায় পড়া চলবে।

আজ রোববার সকাল ১০টা ৫৫ মিনিটে দেশের সবচেয়ে বড় আলোচিত এ মামলার রায় পড়া শুরু করেন বিচারপতি মো. শওকত হোসেনের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিশেষ (বৃহত্তর) হাইকোর্ট বেঞ্চ। বেঞ্চের অন্য দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মো. আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি মো. নজরুল ইসলাম তালুকদার। দুপুর ১টা থেকে ২টা পর্যন্ত বিরতি দিয়ে বিকেল সাড়ে ৪টা পর্যন্ত প্রথম দিনের রায় পড়া শেষে মুলতবি করা হয়।

রায়ের শুরুতে আদালত বলেন, মহান স্বাধীনতার পর ২০০৯ সালের পিলখানা হত্যাকাণ্ড পৃথিবীর ইতিহাসে নজিরবিহীন ঘটনা। এত অল্প সময়ে ৫৭ জন সেনাকে হত্যার ঘটনা পৃথিবীর আর কোথাও ঘটেনি। এ হত্যাকাণ্ডে আমরা আমাদের সূর্য সন্তানদের হারিয়েছি।

রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, এ এক নৃশংস, বর্বরোচিত হত্যাকাণ্ড। এ মামলাটি পরিচালনার ক্ষেত্রে দার্শনিক, সমাজ বিজ্ঞানী, আইন বিজ্ঞানী ও সমাজ বিজ্ঞানীদের গবেষণা, অপরাধের ধরন, কারণ ও পবিত্র কোরআন শরিফের কিছু নির্দেশনাসহ বেশ কিছু ধর্মগ্রন্থের পর্যালোচনা করা হয়েছে।

আদালত বলেন, গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থায় আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করে নৃশংস এ হত্যাকাণ্ড, লুণ্ঠন, জঘন্য অপরাধ সংঘটিত হয়। দেশের ইতিহাসে এত বড় ঘটনা আর ঘটেনি।

আদালত বলেন, এই বিদ্রোহের অন্যতম একটি কারণ ছিল সেনাবাহিনীর কোনো অফিসারকে বিডিআরের প্রধান হিসেবে যেন নিয়োগ দেওয়া না হয়। ইতিহাসের জঘন্যতম ও বর্বরোচিত এই হত্যাকাণ্ড ঘটাতে অমানবিক নির্যাতন, অস্ত্র লুণ্ঠনের মতো ঘটনা ঘটে। এই ঘটনার মাধ্যমে জনমনে ভীতি সৃষ্টির চেষ্টা করা হয়।

আদালত আরো বলেন, ‘আমরা বারবার বিস্মিত হয়েছি এজন্য, যে বিডিআর একাত্তর সালে সীমান্ত রক্ষায় প্রথম প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল, ইতিহাসের সেই ঐতিহাসিক অর্জনকে ভুলুণ্ঠিত করে দেশের আইনের শাসন বিনষ্ট করতে এক কলঙ্কের চিত্র বহন করতে হবে।’

এ সময় আদালত সেনা হত্যার পরিসংখ্যান উল্লেখ করে বলেন, একাত্তরে ৫৫ জন সেনা কর্মকর্তা পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে নিহত হন। আর বিডিআর বিদ্রোহে ৩০ ঘণ্টার মধ্যে ৫৭ সেনা নিহত হন।

আদালত বলেন, ‘শেখ হাসিনার নবগঠিত সরকারকে চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন করতে এবং বিদেশে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে এই বিদ্রোহ ঘটানো হয়।’

পরে দুপুরে অ্যাটর্নি জেনারেলের জবাবে আদালত বলেন, পিলখানা হত্যা মামলার ১০ হাজার পৃষ্ঠার রায় পড়তে কয়েক দিন সময় লাগবে।

আদালত বলেন, ‘এই রায়ে প্রায় এক হাজার পৃষ্ঠার বেশি অবজারভেশন (পর্যবেক্ষণ) দেব। রায়টি সব মিলিয়ে ১০ হাজার পৃষ্ঠার বেশি। রায় পুরো পড়ব না। তবে পুরো পর্যবেক্ষণটি আমরা পড়ে শুনাব। পূর্ণ পর্যবেক্ষণ শেষে আমরা সামারিলি জাজমেন্ট (সংক্ষিপ্ত রায়) দেব। সেখানে রায়ের ফাউন্ডেশন (মূল ভিত্তি) অংশে কোন কারণে কী সাজা পেয়েছেন তা আমরা উল্লেখ করব। এ কারণে কয়েকদিন সময় লাগতে পারে।’

মধ্যাহ্ন বিরতিতে যাওয়ার আগে আদালত রায়ের বাকি অংশ পড়ার জন্য আগামীকাল সোমবার সকালে পুনরায় সময় নির্ধারণ করেন। কিন্তু আইনজীবীদের অনুরোধে আদালত আজ মধ্যাহ্ন বিরতির পর ফের রায় পড়া শুরু করেন।

পরে অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, কয়জন আসামির মৃত্যুদণ্ড বহাল থাকবে, কয়জনের যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বহাল থাকবে, কয়জনের সাজা বহাল থাকবে এবং কোন কোন আসামির দণ্ড খালাস হবে, বা মৃত্যুদণ্ড থেকে যাবজ্জীবন করা হবে, এই ব্যাপারে তিনজন বিচারপতি ঐক্যমতে পৌঁছেছেন বলে জানিয়েছেন। তবে যার যার পর্যবেক্ষণ ভিন্ন ভিন্ন হতে পারে।

গত ১৩ এপ্রিল এ মামলার বিচারিক কার্যক্রম শেষে যেকোনো দিন রায় ঘোষণার জন্য অপেক্ষমাণ (সিএভি) রাখেন হাইকোর্ট। গত ৯ নভেম্বর রায় ঘোষণার জন্য দিন নির্ধারণ করা হয়।

এর আগে ২০১৫ সালে পিলখানা হত্যাকাণ্ড মামলায় বিচারিক আদালতে মৃত্যুদণ্ডাদেশ পাওয়া আসামিদের ডেথ রেফারেন্স ও আপিলের শুনানির জন্য বৃহত্তর বেঞ্চ গঠন করা হয়।

২০০৯ সালের ২৫ ও ২৬ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন বিডিআরের সদর দপ্তরে পিলখানা ট্র্যাজেডিতে ৫৭ সেনা কর্মকর্তাসহ ৭৪ জন প্রাণ হারান। ওই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি লালবাগ থানায় হত্যা ও বিস্ফোরক আইনে দুটি মামলা হয়। পরে মামলা দুটি নিউমার্কেট থানায় স্থানান্তরিত হয়।

পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) দীর্ঘ তদন্ত শেষে হত্যা মামলায় ২৩ বেসামরিক ব্যক্তিসহ প্রথমে ৮২৪ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দাখিল করে। পরে সম্পূরক অভিযোগপত্রে আরো ২৬ জনের নাম অন্তর্ভুক্ত করায় আসামি দাঁড়ায় ৮৫০ জনে।

এ ছাড়া বিস্ফোরক আইনে করা মামলায় ৮০৮ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় সিআইডি। পরে আরো ২৬ জনকে অভিযুক্ত করে মোট ৮৩৪ জনের বিরুদ্ধে সম্পূরক অভিযোগপত্র দেওয়া হয়। বিচার চলার সময় বিডিআরের ডিএডি রহিমসহ চার আসামির মৃত্যু হয়।

রায়ে বিডিআরের সাবেক ডিএডি তৌহিদসহ ১৫২ জনকে মৃত্যুদণ্ডাদেশ দেওয়া হয়। এ ছাড়া বিএনপিদলীয় সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু (প্রয়াত) ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীসহ ১৬০ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এবং ২৫৬ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে সাজা দেওয়া হয়। অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ২৭৭ জনকে খালাস দেওয়া হয়।

রায়ের পর ডেথ রেফারেন্স হাইকোর্টে আসে। অন্যদিকে দণ্ডাদেশ পাওয়া আসামিরা তাঁদের সাজা বাতিল চেয়ে বিভিন্ন সময়ে রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করেন। আপিল শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্টের বিশেষ ব্যবস্থায় সর্বমোট ৩৭ হাজার পৃষ্ঠার পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। এ জন্য মোট ১২ লাখ ৯৫ হাজার পৃষ্ঠার ৩৫ কপি ও অতিরিক্ত দুই কপি পেপারবুক প্রস্তুত করা হয়। এর মধ্যে ৬৯ জনকে খালাসের রায়ের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রপক্ষ আপিল করেন। গুরুত্বপূর্ণ এ মামলার শুনানির জন্য সুপ্রিম কোর্ট বিশেষ উদ্যোগ নেন। বিশেষ ব্যবস্থায় এই মামলার পেপারবুক তৈরি করা হয়।

বিচার হয় ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগারসংলগ্ন আলিয়া মাদ্রাসা মাঠসংলগ্ন অস্থায়ী এজলাসে। বিচার শেষে ঢাকা মহানগর তৃতীয় বিশেষ আদালতের বিচারক মো. আখতারুজ্জামান ২০১৩ সালের ৫ নভেম্বর রায় ঘোষণা করেন।

মামলায় আসামিদের মধ্যে বিএনপি নেতা ও সাবেক সংসদ সদস্য নাসিরউদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু ও স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা তোরাব আলীরও দণ্ড  হয়েছে। সাজা ভোগ করার সময় বিএনপি নেতা নাসির উদ্দিন আহম্মেদ পিন্টু অসুস্থ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন।

রক্তাক্ত ওই বিদ্রোহের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী এ বাহিনীর নাম পুনর্গঠন করা হয়। নামবদলের পর এ বাহিনী এখন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) হিসেবে পরিচিত।

Check Also

রাতে জাতিসংঘে ভাষণ দেবেন প্রধানমন্ত্রী

নিউজ ডেস্ক : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ শনিবার (২৬ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) …

%d bloggers like this: