Home / ফিচার / গল্প / অরিত্রের ভালোবাসা

অরিত্রের ভালোবাসা

মুন্নো চাকমা: গল্পের শুরুটা এমনি হোক….

অরিত্র খুব চুপচাপ স্বভাবের ছেলে, সবে দু’বছর হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছে। ছাত্র হিসেবে খুব একটা মন্দ বা ভালো নয়। তার মেয়ে বন্ধু বলতে নেই বললেই চলে। ছেলে বন্ধু বলতে এইতো হাতে গোন কয়েকজন সবি ছোটবেলার বন্ধু। পাঠ্য বইয়ের চেয়ে গল্পের বই তাকে বেশি টানে। তাও এডভ্যান্চার ধরনের বই সব। যদিও অরিত্র কখনো কোথাও যায় নি ঘুরতে। বন্ধুরা সব যায় এখানে ওখানে ঘুরতে তাকে জোরাজোরি করেও যাওয়ার জন্যে কিন্তু তার কেন জানি কোথাও যাবার হচ্ছেও হয় না। অরিত্রর ঘুরাঘুরির জগতটাও এই বইয়ের মাঝেই। কোন বই পড়তে বসলে সে ওই বইয়ের মাঝেই নিজেকে হারিয়ে ফেলে। মনে হয় যেন সেই ওই গল্পের নায়ক। এই তো সেদিন কি একটা বই পড়ছিল, সময়টা মনে হয় শরতের মাঝামাঝি। সময়টা শরতের মাঝামাঝি হলেও বর্ষার ভেজা গন্ধ মিশে আছে প্রকৃতির সাথে। শরতের আকাশে এই নীল আকাশ আবার এই বৃষ্টি শুরু। সেদিনও গুরিগুরি বৃষ্টি পড়ছে, বারান্দার এক কোণায় বসে অরিত্র কি একটা বই জানি পড়ছিলো একমনে, পাশে চায়ের মগ আর আংগুলের ফাকেঁ জ্বলন্ত সিগারেট। অরিত্রের এই এক বদ অভ্যাস বই পড়ার সময় মগ ভরতি চা খাবে আর সিগারেটের ধোয়াঁ ছাড়বে। সিগারেট খাবার অভ্যাসটা আগে ছিলো না, বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পর ব্যাচেলার জীবন শুরুর পরে বন্ধুদের থেকে একটান দুটান দিতে দিতে অভ্যাস হয়ে যায়। এই মুখে নিয়ে সিগারেটটা একটান দিতেই কলিং বেল বেজে উঠলো। একবার শুনেও না শুনে থাকলো বইয়ে চোখ দিয়ে। আবার বেজে উঠলো কলিং বেলটা, এভাবে না শুনার ভান করে আর কত থাকা যায় তাই অরিত্র বিরক্তি ভাব নিয়ে দরজা খুলতে গেল। তাছাড়া না খুলেই বা কি উপায় সে ছাড়া বাসায় আর কেউ নেই যে দরজা খুলবে, বন্ধুরা সবাই মিলে কুয়াকাটা ঘুরতে গেছে তাই বাসায় সে একা। দরজা খুলে দেখলো সামনে এক কুরিয়ার বয় দাড়িয়ে
বললো, অরিত্র নামের কেউ কি আছে?
বিরক্তি ভাব নিয়ে অরিত্র বললো,
– জ্বি! আমিই অরিত্র, বলুন।
-আপনার নামে একটা পার্সেল আছে।
অরিত্র অবাক হয়ে বললো,
-আমার মানে পার্সেল?
-জ্বি। আপনি এখানে একটি সাইন দিন।
সাইন দেয়ার পর নীল রঙের পেপারে সুন্দর করে মোড়ানো পার্সেল নিয়ে অবাক চোখে প্যাকেটের এপাশ ওপাশ চোখ বুলাতে বুলাতে দরজা বন্ধ করে অরিত্র তার পুরোনো জায়গায় এসে বসলো। প্যাকেটের উপরের একপাশে তার নাম, ঠিকানা এবং আরেক পাশে চন্দ্রাবাতী ছাড়া আর কিছুই নেই লেখা। নামটা দেখে অনেক চেষ্টা করেও অরিত্র চিনতে পারলো না এই নামের কাউকে। মনে মনে ভেবেও দেখলো আর খুজেও নিলো কিন্তু এই নামের কাউকে ভেবে পেলো না। বরং তার মনে হলো এই নাম সে আগে কখনো শুনেও নি।
অরিত্র প্যাকেটটা খুলে দেখলো প্যাকেটের ভিতর খুব সুন্দর একটি লাইটার আর একটি চিরকুট। ধবধবে সাদা কাগজে নীল কালিতে লেখা একটি লাইন, “শুনলাম তুমি সিগারেটের অভ্যাসে বাধা পরেছো”

এই এক লাইনের লেখায় অরিত্রকে বিস্ময় করে তুলেছে বেশ কারন সে যে সিগারেটের অভ্যাস বাধিয়েছে তা কারোর জানা কথা নয় কারন বাসার বাইরে সে যে সিগারেট খাই না বললেই চলে তাও অচেনা এক মেয়ের এমন চিরকুট!! এই নিয়ে তার চিন্তার শেষ নেই কে এই মেয়ে আর এই মেয়ে জানলো কিভাবে। এভাবে ভাবতে ভাবতে তার মনে হলো নিশ্চয় তার বন্ধুরা দুষ্টামি করছে কারন সে ওদের সাথে ট্যুরে যায় নি তাই। এরপরের দিন তার বন্ধুরা বাসায় এসে সবার থেকে অগোছালো ভাবে জানতে চাইলোও যে কেউ এমন দুষ্টামি করেছে কিনা। পরে একে একে সবাই যা বললো তাই নিয়ে অরিত্র নিশ্চিত হলো এদের কেউ এমন করে নি। এভাবে চলতে চলতে অরিত্র এইসব ভুলেই গেলো এসবকিছু।

সেদিন দুপুরে শুয়ে শুয়ে বই পড়ছিল অরিত্র, কলিং বেল দু’বার বাজেই দরজা খুলে দিতেই সামনে কুরিয়ার বয় বললো,
-অরিত্র নামেরর কেউ কি আছে?
-জ্বি। আমি অরিত্র, বলুন।
-আপনার একটি পার্সেল আছে। এইখানে সাইন করুন।
সাইন করারর আগেই অরিত্রেরর মনে পরলো সেই গতমাসের ১৫ তারিখের কথা। যেদিন চন্দ্রাবতী নামের কেউ একজন পার্সেল পাঠিয়েছে। প্যাকেটের দিকে চোখ দিতেই মনে হলো সেই একি প্যাকেট কারন প্যাকেটটি নীল পেপারে মাড়ানো আর ঘড়ির দিকে চোখ বুলাতেই বুজে গেলো আজও ১৫ তারিখ। প্যাকেট খুলে অরিত্র দেখলো একটি কবিতার বই আর সেই একি ধবধবে সাদা রঙের কাগজে নীল কালিতে লেখা, “আর কতো এডভ্যান্চার বই পড়বে, এবার কবিতা পড়ে দেখো”

এভাবেই প্রতিমাসের ১৫ তারিখ অরিত্রের কাছে চন্দ্রাবতীর পার্সেলের সাথে চিরকুট আসে। অরিত্রের খুব ইচ্ছে হয় চন্দ্রাবতীর নামে চিরকুট পাঠাতে কিন্তু অরিত্র জানে তা হবার নয় কারন চন্দ্রাবতীর নাম ছাড়া তার কিছুই নাই জানা। তাই তো প্রতিমাসের চন্দ্রাহারা প্রতি পূর্নিমায় অরিত্র থাকে চন্দ্রাবতীর একটি চিরকুটে অপেক্ষায়……
অরিত্র জানে না এই অপেক্ষার শেষ কোথায় কিন্তু সে থাকে চন্দ্রাবতীর চিরকুটের অপেক্ষায় আর এই অপেক্ষায় মিশে আছে অরিত্রের ভালোবাসা।

Check Also

নড়াইলে রাণী রাশমণি এস্টেটের কাচারী বাড়ী

নড়াইল প্রতিনিধি: বাংলার মহিয়সী নারী লোকমাতা রানী রাসমণির কাছারি বাড়ি ছিল, আমাদের বাংলাদেশের নড়াইল এর …

%d bloggers like this: