Home / জাতীয় / বড় হুজুররা এলেই ওরা বিভক্ত হয়ে পড়ে

বড় হুজুররা এলেই ওরা বিভক্ত হয়ে পড়ে

নিউজ ডেস্ক : কাকরাইলের কেন্দ্রীয় মসজিদে তারা একসঙ্গে নামাজ পড়ছে। এক প্লেটে খাবার খাচ্ছে। রাতে পাশাপাশি ঘুমাচ্ছে।

অথচ ‘বড় হুজুররা’ এলে তারা দুই ধারায় ভাগ হয়ে যাচ্ছে। সংঘর্ষের মানসিকতাও তৈরি হচ্ছে তাদের মধ্যে।

গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে কাকরাইল মসজিদে গিয়ে মুসল্লিদের সঙ্গে কথা বলে এ তথ্য জানা যায়।

এদের মধ্যে তাবলিগ জামাতের দিল্লির নিজামুদ্দিন মারকাজের বর্তমান মুরব্বি মাওলানা সাদ কান্ধলভীর অনুসারী এবং মাওলানা জুবায়েরের অনুসারীরাও আছেন।

এসব সাধারণ মুসল্লি বিরোধ নিয়ে ভিন্ন ভিন্ন কথা বললেও কিছু বিষয়ে একমত। বিশেষ করে তারা বলছে, কাকরাইল মসজিদ ও টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমা ময়দানকে আলাদা করা ঠিক হবে না।

এতে বিরোধের সৃষ্টি হবে। আগের মতোই তাবলিগ জামাতের মাঠ ও কাকরাইল মসজিদ সরকারের হাতে রেখে এবং দুটি অংশকে বসিয়ে সংঘাতময় পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের চেষ্টা করতে হবে।

কেন বিশ্ব ইজতেমা নিয়ে তাবলিগ জামাতের অনুসারীরা দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, সংঘর্ষের নেপথ্যে কারা রয়েছে, দেশের বাইরে থেকে কেন উসকানি দেওয়া হচ্ছে, কোনো কোনো শীর্ষ পর্যায়ের হুজুরের এখানে ব্যক্তিগত স্বার্থ আছে এমন আরো অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে মুসল্লিরা কথা বলে। প্রায় সবারই কথা, তাবলিগ জামাতের ‘বড় হুজুরদের’ স্বার্থের বিরোধের কারণেই গাজীপুরের টঙ্গীতে ইজতেমা মাঠের দখল নিয়ে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়ছে।

গতকাল দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত কাকরাইল মসজিদের ভেতরে অবস্থান করে দেখা যায়, প্রধান ফটকে বেঞ্চ পেতে বসে আছে পুলিশ।

গেটের পাশে ফুটপাত ঘেঁষে দোকানে মুসল্লিদের ভিড়। ভেতরে ঢুকতে ডান পাশে পুলিশ ক্যাম্প। সেখানে ১৫ জন পুলিশ সদস্য পাহারায় রয়েছেন। ভেতরে তাবলিগের দুই পক্ষের সাধারণ মুসল্লিরা অর্থাৎ সাথিরা একসঙ্গে মসজিদে অবস্থান করছে।

সব সময় ইসলামের কথা বলি। নামাজ পড়ি। ইসলাম সব সময় শান্তির কথা বলে। আমরাও শান্তির পথে। আমাদের মধ্যে কোনো পক্ষ-বিপক্ষ নেই।

বিশ্ব ইজতেমা সব মুসলমানের আবেগ। বড় হুজুরদের উচিত সরকারের সঙ্গে বসে এই সমস্যার সমাধান করা। বিশ্ব ইজতেমা যাতে সঠিক সময়ে সুন্দরভাবে হয় তার ব্যবস্থা করা।’

এ সময় তাঁর পাশে অবস্থানকারী দুই পক্ষের দুজন মুসল্লি নাম না প্রকাশের অনুরোধ জানিয়ে একই কথা বলেন। তাঁরা বলেন, “আমরা সাথিরা অর্থাৎ সাধারণ মুসল্লিরা কাকরইল মসজিদে একসঙ্গে নামাজ পড়া থেকে শুরু করে খাওয়াদাওয়া, ঘুমানো, ধর্মীয় আলাপ-আলোচনা করছি।

ঢাকার বাইরে দাওয়াতি কাজেও তাই। আমাদের মধ্যে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু দুই পক্ষের বড় হুজুর ‘মাওলানা আশরাফ আলী ও মাওলানা জুবায়ের’ কাকরাইল মসজিদে এলেই আমরা দুই ভাগ হয়ে যাই। তখন বড় হুজুররা যা নির্দেশ দেন তাই করি।

তাই আমরা বলতে চাই, বড় হুজুররা সরকারের সঙ্গে বসে একটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশ করে বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করুক। আমাদের মধ্যে কোনো সংঘর্ষ চাই না।”

এ সময় কথা হয় মাওলানা আব্দুল্লাহ নামে আরেক তাবলিগের সাথির সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘শান্তিপূর্ণভাবে বিশ্ব ইজতেমার জন্য আমরা কিছু করতে প্রস্তত আছি।

কিন্তু কেন যেন এখানে একটি অপশক্তি কাজ করছে। তারা এর মধ্যে ঢুকে দুটি গ্রুপ করে ফেলেছে। তারা বিশ্ব ইজতেমা চায় না।

তারা বিদেশিদের অর্থের কাছে বিক্রি হয়ে নিজেদের স্বার্থে পরিবেশ নষ্ট করছে। তবে সরকারের উচিত তাবলিগ জামাতটা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা। কারণ দেশ-বিদেশের লাখ লাখ মানুষ এর জন্য প্রতীক্ষায় থাকে।’

মামুন ও খোরশেদ আলম নামে অন্য দুজনও বললেন, ‘সাধারণ মুসল্লিরা কোনো সংঘাত চায় না। দুটি গ্রুপে নেতৃত্বে থাকা বড় হুজুরদের উচিত এই বিরোধের মীমাংসা করা।

এই বিরোধের জন্য দায়ী স্বার্থবাদী হুজুররা। আমাদের কোনো স্বার্থ নাই। যারা ইজতেমা মাঠ দখল করে রেখেছে তারা এর জন্য দায়ী। আমরা শান্তিপূর্ণভাবে বিশ্ব ইজতেমা চাই।’

বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে মসজিদের ভেতরে মুসল্লিদের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ সময় গেটে অবস্থানকারী পুলিশ সদস্যদেরও কিছুটা সতর্ক দেখা যায়।

১৫ জন পুলিশ সদস্যের দায়িত্বপ্রাপ্ত এসআই জমসেদুল আলম বলেন, এখানকার পরিস্থিতি এই ভালো এই মন্দ। দুই পক্ষের বড় হুজুররা এলেই পরিস্থিতি সাংঘর্ষিক রূপ নেয়।

বাকি সময় দুই পক্ষের লোকজন একসঙ্গে সহমর্মিতার সঙ্গে এখানে অবস্থান করে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাতে শীর্ষ পর্যায়ের হুজুররা কাকরাইল মসজিদে অবস্থান করলে তখন গেটে আলাদা পাহারা বসানো হয়।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সাদ অনুসারী মাওলানা আশরাফ আলী বলেন, ‘আমরা কোনো সংঘর্ষ চাই না। আমরা শান্তি চাই। টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান সরকারি নিয়ন্ত্রণে নিয়ে দখলদারমুক্ত রাখতে হবে।

দেশের পরিস্থিতি স্থিতিশীল ও সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সারা দেশে উসকানিমূলক সভা ও প্রপাগান্ডা বন্ধ করতে হবে। তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে বহিরাগতদের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। সারা দেশে আমাদের সাথিদের ওপর যারা হামলা চালাচ্ছে তা বন্ধ করতে হবে।

মাওলানা জুবায়ের অনুসারী মাওলানা আমানুল হক বলেন, মাওলানা জুবায়ের আহমদ ও মাওলানা ওমর ফারুকসহ আমরা কোনো সংঘাত চাই না। তবে সাদপন্থীরা হট্টগোলের সৃষ্টি করছে।

সাদ কান্ধলভিকে তাবলিগের আমির মানা না-মানা নিয়ে তাবলিগ জামাতের দুই পক্ষের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছে। মাওলানা সাদকে তাবলিগের আমির মানেন না দেওবন্দপন্থী আলেমরা।

‘জোড় ইজতেমা’ করার জন্য টঙ্গীর তুরাগ নদের তীরে বিশ্ব ইজতেমা মাঠে অবস্থান নিয়েছিলেন সাদবিরোধী মুসল্লিরা। তাবলিগ জামাতের দুই গ্রুপের সংঘর্ষ চলছে গত বছর থেকে, যা সহিংস রূপ নেয় গত শনিবারের সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে।

এই দ্বন্দ্বের মূলে আছেন তাবলিগ জামাতের কেন্দ্রীয় নেতা, দিল্লির মোহাম্মদ সাদ কান্ধলভি। অন্য অংশে আছেন মাওলানা জুবায়ের আহমদ ও মাওলানা ওমর ফারুকসহ আরো অনেকে।

গত বছর থেকেই সাদ কান্ধলভি তাবলিগ জামাতে সংস্কার করার চেষ্টা করেন। এ নিয়েই মূলত বিরোধের সৃষ্টি হয়। এই বিরোধের কারণে ২০১৮ সালের জানুয়ারি মাসে সাদ কান্ধলভি ইজতেমায় অংশ নেওয়ার জন্য ঢাকায় এলেও ইজতেমায় অংশ নিতে পারেননি। সে সময় তিনি কাকরাইল মসজিদে অবরুদ্ধ ছিলেন।

সাদ কান্ধলভি বলেছিলেন, ‘ধর্মীয় শিক্ষা বা ধর্মীয় প্রচারণা অর্থের বিনিময়ে করা উচিত নয়। যার মধ্যে মিলাদ বা ওয়াজ মাহফিল পড়ে বলে তিনি মনে করেন। তবে তাঁর বিরোর্ধীরা বলছেন, সাদ কান্ধলভি যা বলছেন, তা তাবলিগ জামাতের প্রতিষ্ঠিত নেতাদের নির্দেশিত পন্থার বিরোধী।

ইজতেমা ময়দানে হামলার প্রতিবাদ গজারিয়ায়

ঐতিহাসিক টঙ্গী ইজতেমা ময়দানে ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ওপর সন্ত্রাসী হামলার প্রতিবাদ জানিয়েছে মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া মুবাল্লিগ ও উলামা মাশায়েখ পরিষদ।

তারা অপরাধীদের চিহ্নিত করে খুনি এবং নির্দেশদাতাদের ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে আইনের আওতায় আনাার দাবি জানিয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার সকালে গজারিয়া উপজেলার আনারপুরা জামিয়া ফারুকিয়া রওজাতুল উলুম মাহমুদবাগ মাদরাসায় এক সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়।

সংগঠনটি ছয় দফা দাবি জানিয়ে বলা হয়, ওই হামলার ঘটনায় খুনি এবং নির্দেশদাতা ওয়াসিকুল ইসলাম, খান শাহাবুদ্দীন নাসিমসহ জড়িতদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।

মাওলানা সাদকে ইজতেমার কার্যক্রম থেকে নিষিদ্ধ করতে হবে এবং ইজতেমা ময়দান এ দেশের হকপন্থী আলেমদের হাতে তুলে দিতে হবে।

সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন শায়খুল হাদীস আল্লামা হাসান ফারুক, মুফতি আ. রহীম, হযরত মাওলানা হুসাইন আহমদ, মুফতি আলমগীর, মাওলানা আ. দাইয়ান, মাওলানা ওলিউল্লাহ, মাওলান আবদুল্লাহ কাসেমী, আব্দুর রহমান মাস্টার, রাজিব ঢালী, মোজাম্মেল ঢালী প্রমুখ।

গোপালগঞ্জে প্রতিবাদ সমাবেশ

বিশ্ব ইজতেমার মাঠে বর্বরোচিত হামলার প্রতিবাদে ও দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল গোপালগঞ্জে সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। জেলা মারকাজের মুরব্বি, তাবলিগের সাথি ও উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। দুপুরে গোপালগঞ্জ মারকাজ মসজিদ চত্বরে গোপালগঞ্জ মারকাজের মুরব্বি ডা. হাফেজ মাহফুজুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সমাবেশে গহরডাঙ্গা মাদরাসার মাওলানা আতাউল্লাহ, গোপালগঞ্জ মারকাজ মসজিদের ইমাম মাওলানা আবুল কালাম, হাফেজ আবু মুসা প্রমুখ বক্তব্য দেন। তাঁরা টঙ্গীতে আগামী ইজতেমা পূর্বঘোষিত ১৮, ১৯, ২০ জানুয়ারি এবং ২৫, ২৬, ২৭ জানুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হওয়ার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

বক্তরা ‘হামলার নির্দেশদাতা’ ওয়াসিকুল ইসলাম ও শাহাবুদ্দীন নাসিমসহ জড়িতদের দ্রুত আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি জানান। সমাবেশ শেষে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করা হয়।

Print Friendly, PDF & Email

Check Also

আজ খালেদার ভোটে থাকার বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত

নিউজ ডেস্ক :  আসন্ন একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অংশগ্রহণ অনেকটাই …